২৫ এপ্রিল ২০২৬, শনিবার। সেদিন সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ছিল কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের অনার্স প্রথম বর্ষের ভর্তি পরীক্ষা। পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা ছিল নাগেশ্বরী উপজেলার কালীগঞ্জ ইউনিয়নের সিদরাতুন ইসলামের।

সিদরাতুনের বাড়ি কালীগঞ্জ ইউনিয়নে। নুনখাওয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং নাগেশ্বরী সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেছেন তিনি। এরপর তাঁর স্বপ্ন ছিল কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজে অনার্সে ভর্তি হয়ে উচ্চশিক্ষার পথ এগিয়ে নেওয়া। কিন্তু ২৫ এপ্রিলের সেই সকালটি তাঁর স্বপ্নপূরণের বদলে হয়ে ওঠে দুর্ভোগের।

সারারাতের বৃষ্টিতে গ্রামের রাস্তা কাদা ও পানিতে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। পরীক্ষার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হন সিদরাতুন। যানবাহনের সংকটে প্রায় ৩০ মিনিট পায়ে হেঁটে তাঁকে নুনখাওয়া বাজার পর্যন্ত যেতে হয়।
বাজারে পৌঁছেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। সিদরাতুনের ভাষ্য, সারারাত বৃষ্টির কারণে অটোরিকশাগুলোতেও পর্যাপ্ত চার্জ ছিল না। ফলে যানবাহনের জন্য অপেক্ষা ও নানা প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত কুড়িগ্রাম শহরের উদ্দেশে রওনা দিতে হয় তাঁকে। অনেক কষ্টের পর তিনি কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজে পৌঁছান। কিন্তু ততক্ষণে পরীক্ষার নির্ধারিত সময় প্রায় শেষ।

পরীক্ষার নিয়ম অনুযায়ী কলেজের গেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। অনেক অনুরোধের পর সিদরাতুন ভেতরে প্রবেশের সুযোগ পান। কিন্তু ভেতরে ঢোকার পরও তাঁকে পরীক্ষার কক্ষ ও নিজের আসন খুঁজে নিতে হয়। এতে আরও মূল্যবান সময় চলে যায়। সবকিছু শেষ করে যখন তিনি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হন, তখন নির্ধারিত এক ঘণ্টার পরীক্ষার সময় প্রায় শেষ হয়ে যায়। এত কষ্ট করে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছেও শেষ পর্যন্ত ঠিকমতো OMR পূরণ করতে পারেননি সিদরাতুন।

একজন শিক্ষার্থীর কাছে এই এক ঘণ্টা হয়তো একটি সাধারণ পরীক্ষার সময়। কিন্তু সিদরাতুনের কাছে এটি ছিল বহুদিনের পড়াশোনা, প্রস্তুতি ও একটি স্বপ্নের মূল্যায়নের সময়।

কাদার পথ পেরিয়ে, নানা প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছেও শেষ পর্যন্ত পরীক্ষা দিতে না পারার ঘটনায় প্রশ্ন উঠছে—

এই পরিস্থিতির দায় কার?

গ্রামীণ সড়কের দুরবস্থা, বৃষ্টির কারণে যানবাহন সংকট, পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় লাগা—এসব কি একজন শিক্ষার্থীর নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা বাস্তবতা নয়? অন্যদিকে, ভর্তি পরীক্ষায় নির্ধারিত সময় ও প্রবেশের নিয়ম মানার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। তাহলে একজন শিক্ষার্থী যখন নির্ধারিত সময়ে কেন্দ্রে পৌঁছাতে গিয়ে প্রাকৃতিক ও যোগাযোগব্যবস্থাজনিত প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হন, তখন তাঁর জন্য কোনো মানবিক বা বিকল্প ব্যবস্থা থাকা উচিত কি না—সেটিও আলোচনার দাবি রাখে।

সিদরাতুনের ঘটনা শুধু একজন শিক্ষার্থীর পরীক্ষা দিতে না পারার গল্প নয়; এটি প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার পথে থাকা যোগাযোগব্যবস্থা ও সুযোগ-সুবিধার বাস্তব চিত্র নিয়েও প্রশ্ন তোলে।