সন্তান আল্লাহর পক্ষ থেকে আমানত। তাই শিশুর লালনপালন শুধু খাদ্য, বস্ত্র ও নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তার ঈমান, চরিত্র, জ্ঞান, মানসিক বিকাশ ও নৈতিক শিক্ষার প্রতিও অভিভাবকের দায়িত্ব রয়েছে। কোরআন ও হাদিসে সন্তান প্রতিপালনের ক্ষেত্রে ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ, শিষ্টাচার, ইবাদত ও নৈতিক শিক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সন্তান আল্লাহর আমানত

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে সেই আগুন থেকে রক্ষা করো, যার ইন্ধন মানুষ ও পাথর।’ সুরা আত-তাহরিম, আয়াত ৬।

এই আয়াতের আলোকে পরিবারের সদস্যদের ঈমান ও আমল সংশোধনে অভিভাবকের দায়িত্বের বিষয়টি স্পষ্ট হয়। সন্তানকে শুধু পার্থিব জীবনের জন্য প্রস্তুত করা নয়, বরং তার মধ্যে আল্লাহভীতি, ন্যায়বোধ ও সৎকর্মের অভ্যাস গড়ে তোলাও গুরুত্বপূর্ণ।

শিশুর প্রতি ভালোবাসা ও কোমল আচরণ

ইসলামে শিশুর প্রতি স্নেহ ও মমতার বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) শিশুদের প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল ছিলেন। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) হজরত হাসান (রা.)-কে চুম্বন করেন। তখন এক ব্যক্তি বললেন, তাঁর দশটি সন্তান আছে, কিন্তু তিনি কাউকে চুম্বন করেননি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে দয়া করে না, তার প্রতি দয়া করা হয় না।’  সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম।

এ হাদিস শিশুর সঙ্গে কোমলতা ও স্নেহপূর্ণ আচরণের গুরুত্ব নির্দেশ করে। শিশুর ভুল সংশোধনের ক্ষেত্রেও অপমান, নিষ্ঠুরতা কিংবা অমানবিক আচরণের পরিবর্তে ধৈর্য ও প্রজ্ঞা অবলম্বন করা ইসলামের শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

ঈমান ও তাওহিদের শিক্ষা

শিশুর চরিত্র গঠনের সূচনাতেই আল্লাহর পরিচয় ও তাওহিদের শিক্ষা দেওয়া উচিত। কোরআনে হজরত লুকমান (আ.)-এর উপদেশের মাধ্যমে সন্তানকে আকিদা ও নৈতিক শিক্ষা দেওয়ার একটি সুন্দর দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হয়েছে।

তিনি তাঁর সন্তানকে বলেন, ‘হে আমার বৎস! আল্লাহর সঙ্গে শরিক করো না। নিশ্চয়ই শিরক মহা জুলুম।’  সুরা লুকমান, আয়াত ১৩।

পরবর্তী আয়াতগুলোতে লুকমান (আ.) তার সন্তানকে নামাজ প্রতিষ্ঠা, সৎকাজের নির্দেশ, অসৎকাজ থেকে নিষেধ এবং ধৈর্য ধারণের উপদেশ দেন। সুরা লুকমান, আয়াত ১৭।

অর্থাৎ ইসলামী শিশুশিক্ষায় বিশ্বাস, ইবাদত ও চরিত্র একে অপরের পরিপূরক।

নামাজের অভ্যাস গড়ে তোলা

শিশুকে ছোটবেলা থেকেই নামাজের প্রতি অভ্যস্ত করার বিষয়ে হাদিসে নির্দেশনা এসেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা তোমাদের সন্তানদের সাত বছর বয়সে নামাজের নির্দেশ দাও এবং দশ বছর বয়সে এ বিষয়ে তাদের শাসন করো; আর তাদের শয্যা পৃথক করে দাও।’  সুনান আবু দাউদ, হাদিস ৪৯৫।

এ নির্দেশনার উদ্দেশ্য শিশুর মধ্যে ইবাদতের অভ্যাস তৈরি করা। তবে শিশুর বয়স, বোধশক্তি ও পরিস্থিতি বিবেচনা করে শিক্ষাদান ও সংশোধনের পদ্ধতি গ্রহণ করা প্রয়োজন।

চরিত্র ও শিষ্টাচার শিক্ষা

শিশুকে সত্যবাদিতা, আমানতদারি, বিনয়, পরোপকার ও সংযমের শিক্ষা দেওয়া ইসলামী তারবিয়তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সুরা লুকমানে সন্তানকে অহংকার থেকে বিরত থাকতে এবং চলাফেরা ও কথাবার্তায় সংযত হতে বলা হয়েছে। সুরা লুকমান, আয়াত ১৮-১৯।

অভিভাবকের আচরণও শিশুর শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কারণ শিশু শুধু উপদেশ শুনে শেখে না, বরং পরিবারে যা দেখে তার মধ্য দিয়েও আচরণগত শিক্ষা গ্রহণ করে।

সন্তানদের প্রতি ন্যায়বিচার

সন্তানদের মধ্যে বৈষম্য না করার বিষয়েও ইসলামে সতর্কতা রয়েছে। হজরত নুমান ইবনে বশির (রা.) থেকে বর্ণিত, তাঁর পিতা তাঁকে একটি উপহার দিলে তাঁর মা রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে সাক্ষী রাখতে বলেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) জিজ্ঞেস করেন, তিনি কি তাঁর সব সন্তানকে অনুরূপ উপহার দিয়েছেন? তিনি না বললে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আল্লাহকে ভয় করো এবং তোমাদের সন্তানদের মধ্যে ন্যায়বিচার করো।’  সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম।

অতএব ভালোবাসা, উপহার ও পারিবারিক আচরণে সন্তানদের প্রতি অযথা পক্ষপাত সৃষ্টি না করাই ইসলামের নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

শারীরিক ও পারিবারিক যত্ন

শিশুর শারীরিক প্রয়োজন পূরণ করাও অভিভাবকের দায়িত্ব। কোরআনে মায়েদের সন্তানকে পূর্ণ দুই বছর দুধ পান করানোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যারা দুধপানকাল পূর্ণ করতে চায়। একই সঙ্গে সন্তানের পিতা-মাতার ভরণপোষণ ও পারস্পরিক পরামর্শের বিষয়ও বলা হয়েছে।  সুরা আল-বাকারা, আয়াত ২৩৩।

এ থেকে বোঝা যায়, ইসলামে শিশুর পরিচর্যার ক্ষেত্রে খাদ্য, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা এবং পারিবারিক দায়িত্বকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

কন্যাসন্তানের মর্যাদা

কন্যাসন্তানের প্রতি যত্ন ও উত্তম আচরণ ইসলামে বিশেষ মর্যাদা পেয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) কন্যাসন্তানদের লালনপালন ও তাদের প্রতি সদাচরণের জন্য বিশেষ ফজিলতের কথা বলেছেন। হজরত আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে দুই কন্যার দায়িত্ব পালনকারী ব্যক্তির জন্য জান্নাতের সুসংবাদের কথা এসেছে।  জামি‘ আত-তিরমিজি, হাদিস ১৯১৬।

সুতরাং কন্যাসন্তানকে বোঝা হিসেবে দেখা ইসলামী মূল্যবোধের পরিপন্থী। সন্তান ছেলে হোক কিংবা মেয়ে, উভয়ের প্রতিই দায়িত্ব ও মমতা সমানভাবে প্রয়োজন।

জ্ঞান ও উত্তম পরিবেশ

শিশুর শিক্ষা শুধু ধর্মীয় জ্ঞান অর্জনে সীমাবদ্ধ নয়। তার বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক বিকাশের জন্য উপকারী জ্ঞান, শৃঙ্খলা ও উত্তম পরিবেশ নিশ্চিত করাও প্রয়োজন। পরিবারে অশ্লীলতা, মিথ্যা, প্রতারণা ও অন্যায়কে স্বাভাবিক করে তুললে শিশুর চরিত্রে তার প্রভাব পড়তে পারে। বিপরীতে সত্যবাদিতা, সালাম, শিষ্টাচার, ইবাদত ও পরস্পরের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের পরিবেশ শিশুর নৈতিক বিকাশে সহায়ক হতে পারে।

অভিভাবকের দায়িত্ব

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।’  সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম।

এই হাদিস সন্তান প্রতিপালনের দায়িত্বের ব্যাপকতা স্মরণ করিয়ে দেয়। অভিভাবকের দায়িত্ব শুধু সন্তানের প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহ করা নয়; তার বিশ্বাস, আচরণ, শিক্ষা ও নৈতিক বিকাশের প্রতিও দায়িত্বশীল থাকা জরুরি।

ইসলামের দৃষ্টিতে শিশু লালনপালন একটি আমানত ও দায়িত্ব। ভালোবাসা দিয়ে শিশুর হৃদয় জয় করা, তাওহিদের শিক্ষা দেওয়া, নামাজ ও ইবাদতে অভ্যস্ত করা, সত্য ও ন্যায়ের পথে পরিচালিত করা, সন্তানদের মধ্যে ন্যায়বিচার করা এবং তাদের শারীরিক ও মানসিক প্রয়োজনের প্রতি যত্নশীল থাকা ইসলামী তারবিয়তের গুরুত্বপূর্ণ দিক।

কোরআনের লুকমান (আ.)-এর উপদেশ এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনাচরণ থেকে স্পষ্ট হয়, শিশুকে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে শুধু শাসন নয়, বরং মমতা, শিক্ষা, আদর্শ ও ধারাবাহিক দিকনির্দেশনাই অধিক গুরুত্বপূর্ণ। একজন শিশুর ভবিষ্যৎ চরিত্র গঠনের প্রথম শিক্ষালয় তার পরিবার; তাই সেই শিক্ষালয়কে সৎ, নিরাপদ ও নৈতিক পরিবেশে পরিণত করাই অভিভাবকের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।