চায়ের কাপে চুমুক দিলে আমরা যে সতেজতা ও ওশেনিজ আমেজ পাই, তার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক শতাব্দী প্রাচীন শ্রম, বঞ্চনা ও রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ইতিহাস। ১৯২১ সালের মে মাসে নিজেদের জন্মভূমিতে ফিরে যাওয়ার আকুল আকুতিতে পথ নেমেছিলেন হাজারো চা-শ্রমিক। চাঁদপুরের মেঘনা ঘাটে ঘটে যাওয়া সেই রক্তাক্ত ও কলঙ্কজনক ঘটনার ১০৫ বছর পূর্ণ হলেও ২০ মে দিনটি আজও রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘চা শ্রমিক দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি। ইতিহাসের সেই ক্ষত সময়ের নিয়মে শুকিয়ে গেলেও, বর্তমানের আধুনিক বাংলাদেশে চা-শ্রমিকদের ভূমিহীনতা, কম মজুরি, অস্বাস্থ্যকর বাসস্থান ও মর্যাদার সংকট আজও মোছেনি।

‘গাছ হিলেগা, রুপিয়া মিলেগা’: শোষণের ঔপনিবেশিক জাল

ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে (১৮৩৪-৩৫ সালের দিকে) ব্রিটিশ শাসকেরা ভারতের উত্তর প্রদেশ, বিহার, উড়িষ্যা, ঝাড়খণ্ড ও মধ্যপ্রদেশের চরম দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে এক নির্মম মিথ্যা প্রলোভনে ফেলে আসাম ও বৃহত্তর সিলেটের চা-বাগানগুলোতে নিয়ে আসে। তাঁদের বলা হয়েছিল, “গাছ হিলেগা, রুপিয়া মিলেগা” (অর্থাৎ, চা-গাছ নাড়া দিলেই টাকা মিলবে)। কিন্তু বাগানের চার দেয়ালের বন্দিজীবনে এসে তাঁদের ভুল ভাঙতে সময় লাগেনি। দাসত্বের চেয়েও করুণ শ্রম, নামমাত্র মজুরি, চাবুকের আঘাত আর বাগান মালিকদের (প্ল্যান্টার্স) অমানবিক নির্যাতন হয়ে ওঠে তাঁদের নিত্যদিনের নিয়তি। এই অবরুদ্ধ ও শৃঙ্খলিত জীবন থেকে মুক্তি পেয়ে নিজ নিজ জন্মভিটা বা ‘মুল্লুকে’ ফিরে যাওয়ার সুপ্ত ক্ষোভই পরবর্তীতে এক বিশাল গণবিস্ফোরণের রূপ নেয়।

‘চরগোলা এক্সোডাস’ ও চাঁদপুরের অভিমুখে ৩০ হাজার শ্রমিক
১৯২১ সালের মে মাসের শুরুতে তৎকালীন মহাত্মা গান্ধীর ‘অসহযোগ আন্দোলন’ এবং স্বরাজের ডাক চা-শ্রমিকদের মাঝে নতুন স্বাধীন চেতনার স্ফুলিঙ্গ ছড়ায়। ৩ মে প্রথম সিলেটের আনিপুর চা-বাগানের প্রায় ৭৫০ জন শ্রমিক স্ত্রী-সন্তানদের হাত ধরে কর্তৃপক্ষের বন্দুকের নল উপেক্ষা করে বাগান থেকে বেরিয়ে পড়েন। ভারতের ইতিহাসে এই ঐতিহাসিক ঘটনাটি ‘চরগোলা এক্সোডাস’ নামে পরিচিত। পণ্ডিত গঙ্গাচরণ দীক্ষিত এবং দেওশরণ ত্রিপাঠীর মতো শ্রমিক নেতাদের দূরদর্শী নেতৃত্বে এই আন্দোলন দ্রুত দুই উপত্যকার সব বাগানে ছড়িয়ে পড়ে । “গান্ধী মহারাজ কি জয়” স্লোগান তুলে কাছাড় ও সিলেট অঞ্চলের প্রায় ৩০ হাজার চা-শ্রমিক পায়ে হেঁটে, মাইলের পর মাইল পথ পাড়ি দিয়ে চাঁদপুরের মেঘনা ঘাটের দিকে এগিয়ে যান। তাঁদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল নদীপথে গোয়ালন্দ হয়ে নিজ নিজ আদি নিবাসে ফিরে যাওয়া। কিন্তু চাঁদপুরে পৌঁছানোর পর ব্রিটিশ প্রশাসন ও স্টিমার কোম্পানিগুলোর যোগসাজশে তাঁদের আটকে দেওয়া হয়, যা পরিস্থিতিকে চরম উত্তপ্ত করে তোলে।

২০ মে: মেঘনার জলে রক্তের দাগ ও নৃশংসতা
১৯২১ সালের ২০ মে গভীর রাতে চাঁদপুরের রেল স্টেশন ও স্টিমার ঘাটে ক্লান্ত-শ্রান্ত হাজার হাজার শ্রমিক যখন খোলা আকাশের নিচে ঘুমাচ্ছিলেন, তখন নেমে আসে ব্রিটিশ প্রশাসনের বর্বরতম আঘাত। তৎকালীন কমিশনার কিরণ চন্দ্র দেব ও ম্যাজিস্ট্রেট সুশীল সিংহের নির্দেশে গোর্খা রাইফেলসের একদল সৈন্য নিরস্ত্র ও ঘুমন্ত শ্রমিকদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। শুধু নির্বিচারে গুলিবর্ষণই নয়, সৈন্যদের ধারালো বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে এবং লাঠিচার্জ করে নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের ক্ষতবিক্ষত করা হয়। ঐতিহাসিক বিভিন্ন বিবরণী থেকে জানা যায়, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর শত শত চা-শ্রমিকের লাশ রাতের অন্ধকারে মেঘনা নদীতে ভাসিয়ে দিয়ে প্রমাণ লোপাটের চেষ্টা করা হয়েছিল। এই নির্মম গণহত্যা ‘মুল্লুকে চলো’ আন্দোলনের ইতিহাসে এক রক্তাক্ত ও কালো অধ্যায় হয়ে আছে।

দেশজুড়ে আন্দোলনের ঢেউ ও রেল-স্টিমার ধর্মঘট
চাঁদপুরের এই পাশবিক হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়লে পুরো উপমহাদেশে তীব্র ক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে। এই নৃশংসতার প্রতিবাদে বীর দেশপ্রিয় যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্তের নেতৃত্বে ‘আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ে’ এবং স্টিমার শ্রমিকেরা টানা আড়াই মাস ঐতিহাসিক ধর্মঘট পালন করেন। চা-শ্রমিকদের রক্তের বদলা নিতে গিয়ে প্রায় ৫ হাজার রেল কর্মচারী নিজেদের চাকরি হারান। এই আন্দোলনটি প্রমাণ করেছিল যে ‘মুল্লুকে চলো’ কেবল চা-বাগানের ভেতরের কোনো অসন্তোষ ছিল না, বরং এটি ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের ভিত কাঁপিয়ে দেওয়া এক অবিনাশী জাতীয় প্রতিবাদ।

১০৫ বছর পরও উপেক্ষিত রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি
এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে প্রতিবছর ২০ মে দিনটিকে চা-শ্রমিকেরা ‘চা শ্রমিক দিবস’ হিসেবে পালন করে আসছেন। সাম্প্রতিক ২০২৫ ও ২০২৬ সালেও মে মাসে সিলেট, শ্রীমঙ্গলসহ দেশের বিভিন্ন চা-বাগানে শহীদদের স্মরণে কালো ব্যাজ ধারণ ও র‍্যালি করা হয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলো, স্বাধীনতার এত বছর পরও ২০ মে দিনটি কোনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি বা সবেতন ছুটি পায়নি। যেখানে প্রতিবছর রাষ্ট্র বিপুল আয়োজনে ‘জাতীয় চা দিবস’ পালন করে, সেখানে চা উৎপাদনের মূল কারিগরদের আত্মত্যাগের দিনটি আজো রাষ্ট্রীয় ক্যালেন্ডারে উপেক্ষিত।

চার প্রজন্ম পার, তবু মেলেনি এক খণ্ড ভূমির মালিকানা
‘মুল্লুকে চলো’ আন্দোলনের মূল সুর ছিল নিজের মাটির অধিকার। অথচ আজ ১০৫ বছর পরও চা-শ্রমিকদের জীবনে ভূমির প্রশ্নটি সবচেয়ে বড় আইনি ও কাঠামোগত সংকট। বাংলাদেশের চা-বাগানের জমিগুলো মূলত সরকারের কাছ থেকে বাগান মালিকেরা দীর্ঘমেয়াদি ইজারা বা ‘লীজ’ নেন। ফলে চার থেকে পাঁচ প্রজন্ম ধরে এই মাটিতে রক্ত-ঘাম ঝরিয়ে বসবাস করলেও, শ্রমিকদের নিজস্ব বসতভিটার ওপর কোনো ব্যক্তিগত মালিকানার দলিল বা খতিয়ান নেই। চাকরি চলে গেলে বা শারীরিক সক্ষমতা হারালে মুহূর্তের মধ্যে তাঁদের বাসস্থান হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়, যা তাঁদের এক স্থায়ী দাসত্ব ও পরনির্ভরতার শৃঙ্খলে আটকে রেখেছে।

মজুরির ফ্রেমে বন্দি পুষ্টি ও স্বাস্থ্যের সংকট
২০২২ সালে দীর্ঘ আন্দোলনের পর চা-শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ১২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৭০ টাকা করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানের লাগামহীন বাজারদরের তুলনায় দৈনিক ১৭০ টাকা মজুরি একটি পরিবারের জন্য এক ধরনের তামাশা মাত্র। ২০২৫ সালে চা-শ্রমিকদের জাতীয় সম্মেলনে দৈনিক ৬০০ টাকা মজুরি ও বৈষম্য অবসানের দাবি তোলা হলেও তা আজো আলোর মুখ দেখেনি। এই নামমাত্র মজুরির কারণে চা-বাগানের ভেতরে এক ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, চা-বাগানের প্রায় ৪৫ শতাংশ শিশু পুষ্টিহীনতার কারণে খর্বকায় (Stunted) এবং প্রায় ৪৭ শতাংশ শিশু কম ওজনের শিকার। অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে যক্ষ্মা ও ম্যালেরিয়ার মতো রোগ শ্রমিক লাইনের পরিবারগুলোতে নিত্যদিনের সঙ্গী। তারা যে চা পাতা নিজেদের হাতে তোলে, সামান্য দুধ-চিনি কিনে সেই চায়ের স্বাদ নেওয়ার সামর্থ্যও অনেক পরিবারের জোটে না।

ইতিহাস কি শুধু শ্রমিকের স্মৃতিরক্ষায় থাকবে?
১০৫ বছর পরও ‘মুল্লুকে চলো’ আন্দোলনের সঠিক ইতিহাস সাধারণ পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত হয়নি, চাঁদপুরের সেই স্মৃতিবিজড়িত ঘাটে কোনো স্মৃতিস্তম্ভ বা নিহতের তালিকাও তৈরি করা হয়নি। ইতিহাস আজ কেবল শ্রমিকদের নিজস্ব উঠোন বা বাগানের পিলখানার আলোচনা সভাতেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে।

শতবর্ষের ঋণ ও আমাদের দায়বদ্ধতা
এক শতাব্দী আগে চা-শ্রমিকেরা স্লোগান দিয়েছিলেন ‘মুল্লুকে চলো’ বা নিজের দেশে চলো। আজ ১০৫ বছর পর তাঁদের উত্তরসূরিদের সামনে নতুন এক প্রশ্ন—যে দেশের মাটিকে উর্বর করতে চার প্রজন্ম ধরে তাঁরা জীবন বিলিয়ে দিচ্ছেন, সেই স্বাধীন দেশের মাটিতে তাঁদের নাগরিক ও মানবিক অধিকার ঠিক কতটা নিশ্চিত?
২০ মে-কে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘চা শ্রমিক দিবস’ ঘোষণা করা ইতিহাসের প্রতি একটি প্রতীকী সম্মান হতে পারে। তবে তার চেয়েও বড় সম্মান হবে—আজকের আধুনিক বাংলাদেশের মূলধারার সাথে চা-শ্রমিকদের যুক্ত করে তাঁদের ন্যায্য মজুরি, ভূমির নিশ্চয়তা, নিরাপদ বাসস্থান, মানসম্মত শিক্ষা ও একটি মর্যাদাপূর্ণ জীবনের অধিকার নিশ্চিত করা।