চরে কৃষির সম্ভাবনা থাকলেও যোগাযোগ, পরিবহন, সেচ ও উৎপাদন খরচের চাপে বিপাকে পড়েছেন কৃষকেরা। নদীর বুকে জেগে ওঠা চর। চারদিকে বিস্তীর্ণ বালুচর আর ফসলের মাঠ। এই চরই কারও কাছে বসতি, আবার কারও কাছে জীবিকার একমাত্র অবলম্বন।

বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে চরজমি জেগে উঠলে শুরু হয় কৃষকের ব্যস্ততা। ভুট্টা, পাট, ধান, কালাই ও বাদামসহ বিভিন্ন ফসল চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করেন তারা। কিন্তু ফসল ফলানোর পরও যেন শেষ হয় না কৃষকের দুর্ভোগ। যোগাযোগব্যবস্থা, ফসল পরিবহন, সীমিত বিদ্যুৎ সংযোগ এবং জ্বালানি তেলের বাড়তি দামের কারণে বাড়ছে উৎপাদন খরচ। চরাঞ্চলের কৃষকদের অন্যতম বড় সমস্যা হলো বছরে মাত্র একবার চাষাবাদের সুযোগ পাওয়া। দীর্ঘ সময় পানির নিচে থাকার কারণে বছরের অন্য সময়ে জমি চাষের উপযোগী থাকে না। ফলে একটি ফসলের ওপরই অনেকটা নির্ভর করতে হয় কৃষকদের। প্রাকৃতিক দুর্যোগে সেই ফসল নষ্ট হলে তাদের সামনে তৈরি হয় বড় ধরনের অনিশ্চয়তা।

চাষাবাদের ক্ষেত্রেও রয়েছে নানা সংকট। এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ থাকলেও তা সীমিত। প্রয়োজনীয় সময়ে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ না পাওয়ায় কৃষকদের জ্বালানি তেলে চালিত যন্ত্র ব্যবহার করে জমি চাষ ও সেচ দিতে হয়। সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় এসব কাজে ব্যয়ও বেড়েছে। ফলে ফসল উৎপাদনের শুরুতেই কৃষকের খরচ বাড়ছে। চর রসুলপুর এলাকার কৃষক শামসুল হক। আগে তিনি ঢাকার হেমায়েতপুর এলাকায় থাকতেন। সেখানে জমি বর্গা নিয়ে চাষাবাদ করতেন। প্রায় দুই বছর আগে তিনি কুড়িগ্রামে ফিরে এসে পৈতৃক সম্পত্তিতে চাষাবাদ শুরু করেন। তবে নিজের জমিতে ফিরে এসেও স্বস্তিতে নেই তিনি।

শামসুল হকের ভাষায়, তার প্রধান সমস্যাগুলোর একটি হলো নিয়মিত যাতায়াত ও ফসল পরিবহন। তিনি জানান, বন্যার সময় চরাঞ্চলের প্রায় সবকিছু পানির নিচে চলে যায়। পানি নেমে যাওয়ার পরও কৃষকের দুর্ভোগ শেষ হয় না। জমি থেকে প্রায় ১.৫ থেকে ২ কিলোমিটার দূরে নৌকা রাখতে হয়। ফলে মাঠ থেকে ফসল মাথায় করে নৌকা পর্যন্ত নিয়ে যেতে হয়। মাথায় ফসলের বোঝা, পায়ে চরের বালু—এভাবেই জমি থেকে নৌকা পর্যন্ত ফসল পৌঁছে দেন চরাঞ্চলের কৃষকেরা। এতে বাড়তি শ্রমের পাশাপাশি সময় ও পরিবহন ব্যয়ও বাড়ে। ফসল উৎপাদনের পর বাজারে পৌঁছানোর আগেই কৃষকের খরচের খাত আরও দীর্ঘ হয়।

শামসুল হকের মতো আরও অনেক কৃষকের কাছে চরজমিই জীবিকার প্রধান অবলম্বন। কিন্তু এই জীবিকা নির্ভর করছে নদী ও প্রকৃতির ওপর। বন্যা কখন আসবে, কতদিন পানি থাকবে কিংবা নদীভাঙনে জমির কতটুকু টিকে থাকবে—এসব অনিশ্চয়তার মধ্যেই তাদের কৃষিকাজ চালিয়ে যেতে হয়।

চরাঞ্চলের কৃষকেরা বলছেন, উৎপাদন খরচ কমাতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, সহজ সেচব্যবস্থা এবং কৃষিপণ্য পরিবহনের উন্নত ব্যবস্থা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে বাড়তি উৎপাদন খরচের চাপ কিছুটা কমবে। নদীর বুকে গড়ে ওঠা এই চর যেমন কৃষকের হাতে ফসল তুলে দেয়, তেমনি প্রতিনিয়ত তাদের সামনে দাঁড় করায় নতুন অনিশ্চয়তা। তাই চরাঞ্চলের কৃষকের কাছে কৃষি শুধু পেশা নয়—এটি টিকে থাকার লড়াই।