
কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি:
কুড়িগ্রামের উলিপুরে ব্রহ্মপূত্র নদ বেষ্টিত সাহেবের আলগা ইউনিয়নে কর্মসৃজন প্রকল্পের ৮৮৬ জন শ্রমিকের ৩৫লাখ টাকা হরিলুটের অভিযোগ উঠেছে। এনিয়ে শ্রমিকরা প্রতিবাদ করলে সেখানে উপস্থিত উলিপুর থানা ও নামাজের চর পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের সদস্যরা উভয়কে শান্ত করে। অভিযোগ উঠেছে শ্রমিকদের বিতরণের অর্থ হাতিয়ে নিয়ে আয়োজন করা হয় ভূরিভোজের। ঘটনাটি ঘটেছে শনিবার (৩১ জুলাই) ওই ইউনিয়নের চর দুর্গাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে। উলিপুর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার সাহেবের আলগা ইউনিয়নে ২০২০-২১ অর্থ বছরে কর্মসৃজন কর্মসূচি (মঙ্গা) প্রকল্পে ৮৮৬ জন শ্রমিক রাস্তাসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক মাটির কাজ করেন। শ্রমিকরা দু’দফায় ৮০ দিন কাজ করেন। ২শ টাকা করে ৮শ ৮৬জন শ্রমিকের ৮০ দিনের পাওনা হিসেবে ১ কোটি ৪১ লাখ ৭৬ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়। প্রতি শ্রমিকের জন্য ১৬ হাজার টাকা বরাদ্দ তোলা হলেও বিভিন্ন খরচের কথা বলে ইউপি চেয়ারম্যান ও মেম্বারগণ প্রত্যেকের কাছ থেকে ৪ হাজার টাকা করে কর্তন করার সিদ্ধান্ত জানালে শ্রমিকরা ক্ষুব্ধ হয়। ফলে সকাল ৮টায় টাকা বিতরনের উদ্যোগ নেয়া হলেও কয়েক দফায় বিতরণ বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় শ্রমিকরা প্রতিবাদ করলে ইউপি চেয়ারম্যান সিদ্দিক আলী মন্ডল, পরিষদের মেম্বারগণ ও তাদের লোকজনের সাথে বাকবিতন্ডা ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এসময় সেখানে উপস্থিত উলিপুর থানা থেকে আগত ৮জন পুলিশ সদস্য ও ওই চরে অবস্থিত নামাজের চর পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের সদস্যরা শ্রমিকদের শান্ত করেন। এরই মাঝে অগ্রণি ব্যাংকের লোকজনেরা দুপুর ১২টার দিকে বিতরণ শুরু করে। তারা ১৬ হাজার টাকা করে চেয়ারম্যান মেম্বারদের হাতে তুলে দিলেও জনপ্রতিনিধিরা কৌশলে ৪ হাজার টাকা করে কেটে নেয়। অভিযোগ উঠেছে, এই টাকা পরবর্তীতে জনপ্রতিনিধি ও অন্যান্যরা যোগসাজশে ভাগ বাটোয়ারা করে নেন। এছাড়া বিতরণকালে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) সিরাজুদৌলা পাশের একটি বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। বিতরণ শেষে সেখানে চেয়ারম্যান, মেম্বারগণ, বিতরণকারীরা, পুলিশ সদস্যরা ও দলীয় লোকজন শ্রমিকদের অর্থে ভুরিভোজ করেন। এ সময় বিভিন্ন এলাকার কিছু নামধারী সাংবাদিক ওই ভুরিভোজে অংশ নেন বলে জানা গেছে। শ্রমিক কানচু মিয়া, পরীভানু, আমিরজান, সোনাভানু অভিযোগ করেন, আমগো (আমরা) ৮০দিন কামকাজ করছি। মেম্বার-চেয়ারম্যান ১৬ হাজার টেকা (টাকা) না দিয়া ১২ হাজার টেকা দিসে। আমাগো হের (তার) বিচার চাই। উপকারভোগী ৫ নং ওয়ার্ডের জবেদা খাতুন জানান, চেয়ারম্যান ও মেম্বারা আমাকে জোড় করে ১২ হাজার টাকা দিল। আমি আল্লাহর কাছে বিচার দিয়েছি। ৪ হাজার টাকা নেওয়ার বিষয় জানতে চাইলে সাহেবের আলগা ইউপি সদস্য কামাল হোসেন জানান, বিভিন্ন খরচ বাবদ এই টাকা নেওয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে সাহেবের আলগা ইউপি চেয়ারম্যান সিদ্দিক মন্ডল বলেন, অগ্রণী ব্যাংকের লোকজন ও পিআইও টাকা বিতরন করেছেন। টাকা কম দেওয়ার বিষয় আমি কিছুই জানিনা। এ ব্যাপারে নামাজের চর পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-পরিদর্শক (এসআই) আব্দুর রাজ্জাক জানান, সেখানে বিশৃংখলা সৃষ্টি হলে উলিপুর থানা পুলিশ ও তদন্ত কেন্দ্রের পুলিশ সদস্যরা উপস্থিত থেকে বিতরণ কার্যক্রমে সহযোগিতা করে। অভিযোগ প্রসঙ্গে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা সিরাজুদৌলা জানান, ওই টাকা বিতরনের জন্য ইউএনও সাহেব আমাকে এবং ব্যাংকের ম্যানেজারকে (অগ্রনী) ঘটনাস্থলে পাঠিয়েছিলেন। টাকার অংক বেশি থাকায় পুলিশ বিভাগের সহযোগিতা নেয়া হয়। শ্রমিকদের টাকা কেটে নেয়ার বিষয়টি সঠিক নয়। আমরা সরাসরি উপকারভোগীদের হাতে টাকা তুলে দিয়েছি তাই যারা সুবিধা করতে পারেনি তারাই টাকা আত্মসাথের বিষয় অপপ্রচার করছে। আর ভুরিভোজের বিষয়ে বলেন, দুর্গম এলাকায় নিজস্ব ব্যাস্থাপনায় আমাদের খেতে হয়েছে। জেলা ত্রাণ ও পূর্ণবাসন কর্মকর্তা আঃ হাই সরকার বলেন, বিষয়টি আমি শুনেছি। অনেক উপরমহল থেকে আমাকে ফোন করা হয়েছে। ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা দেয়া হয়। পরে কি হয় তা বুঝু মুশকিল। ব্যাপক অনুসন্ধানে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনেকে জানান, জাইকার প্রকল্পের কাজ নাকি পি আইও সিরাজুদ্দৌলা অন্যনামে নিজে ঠিকাদারী করছে। খোঁজ নিলে থলের বিড়াল বেড়িয়ে আসবে বলে সংশ্লিষ্ট এলাকাবাসী জানান। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নূর-এ-জান্নাত রুমি জানান, দায়িত্বপ্রাপ্তরা শ্রমিকদের হাতে টাকা তুলে দিয়েছে। এরপর তারা কি করেছে সেটা আমি জানি না। জনপ্রতিনিধিরা যদি ৪ হাজার টাকা করে উপকারভোগীদের কাছ থেকে কেটে নিয়ে থাকে, তাহলে এ বিষয়ে কেউ অভিযোগ করলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।




