ধর্মীয় সংঘাতে বলির পাঠা দি আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গন

0
0

ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি : পৃথিবীর আদিভাষা সঙ্গীত। আর সঙ্গীতের ব্যাকরণ মানা হয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতকে। অবিসংবাদিতভাবে উপমহাদেশীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের পুরোধা মানা হয় সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ’কে।’সুরের তীর্থভূমি’ ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর এলাকার কুমারশীল মোড় এলাকায় ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁনের নামে ১৯৫৬ সালে ৫৬ শতাংশ জমির উপর প্রতিষ্ঠিত সুরসম্রাট দি আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গনে দ্বিতীয়বারের মতো গত ২৭ মার্চ (শনিবার) চালানো হয় এক নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞ।

কর্তৃপক্ষ বলছেন, ২০১৬ সালের আক্রমণে হওয়া ক্ষয়ক্ষতির তুলনায় এবারের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি। এবার

ধর্মীয় সংঘাতে বলির পাঠা এবং দি আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গন
ধর্মীয় সংঘাতে বলির পাঠা এবং দি আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গন

প্রতিষ্ঠানটির প্রতিটি কক্ষে বেছে বেছে হামলা ও ভাঙচুর করা হয়। প্রতিষ্ঠানের ৬টি কক্ষের মধ্যে ৩টি ক্লাসরুম, মুক্ত আলোচনায় ব্যবহৃত সরোদ মঞ্চ, প্রশাসনিক কক্ষ ও স্টোররুমে থাকা বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র, একটি জাদুঘর, চেয়ার-টেবিলসহ অন্যান্য আসবাবপত্র সবকিছু ভেঙে তছনছ করে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়।

প্রতিষ্ঠানটির সাধারণ সম্পাদক বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও নাট্যজন মনজুরুল আলম ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জানাতে গিয়ে বলেন, প্রতিষ্ঠানটির সংগ্রহশালায় থাকা অতি দুর্লভ আড়াইশত বই, আড়াই হাজার ছবি, দলিলপত্র, সংগৃহীত আলাউদ্দিন খাঁ’র লেখা সঙ্গীতের পাণ্ডলিপি, সংগ্রহে থাকা বিভিন্ন দুর্লভ ছবি, সঙ্গীতের যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়েছে। এর মধ্যে ১২টি হারমোনিয়াম, সেতার, তবলা, বেহালা,খঞ্জনি ও বিখ্যাত বাদ্যযন্ত্র সরোদ ছিল।

আর্থিক হিসেবে সব মিলিয়ে প্রায় ৩৫ লাখ টাকার যন্ত্রপাতির ক্ষতি হয়েছে। তিনি আরও বলেন, এবারের হামলা ছিলো অতীতের যেকোনো হামলার চেয়ে বর্বর। যারা মুক্তচিন্তা ও শুদ্ধ সংস্কৃতির অন্যতম ধারক সংগীত চর্চা পছন্দ করে না, তারাই এ হামলা চালিয়েছে। সঙ্গীতাঙ্গনের নৃত্য প্রশিক্ষক জিয়া আমিন বলেন, সংস্কৃতি ও সংগীতের রাজধানী খ্যাত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দি আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গনে বারবার হামলার ঘটনায় মন ভেঙে দিয়েছে আমাদের। প্রতিবার কেন প্রতিষ্ঠানটিতে বর্বর হামলার ঘটনা ঘটে।

আমরা এই ঘটনার বিচার কার কাছে চাইবো। নিকট অতীতে আমরা এসবের বিচার চেয়েও পাইনি, এবারো পাবো কি না তা নিয়ে আমরা সন্দিহান। তবে এসব করে শুদ্ধ সংস্কৃতি ও শুভবুদ্ধির চর্চা নিঃশেষ করা যাবে না। প্রতিষ্ঠানটির নিরাপত্তা প্রহরী প্রবীন্দ্র দাস বলেন, বর্তমানে ঘরগুলো ছাড়া প্রতিষ্ঠানটির আর কিছু রক্ষিত নেই।

আমি প্রতিষ্ঠানটির একটি কক্ষে থাকি। হামলাকারীদের আক্রমণের ভয়ে কেউ ঘটনার দিন আগুন নেভাতে এগিয়ে আসেনি বলেও অভিযোগ তার। ইতিহাস বলছে আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গনে হামলার ঘটনা এবারই নতুন নয়। এর আগে মাদরাসা ছাত্রের সাথে বাকবিতণ্ডার জেরে আহত হয়ে মৃত্যুর ঘটনায় ২০১৬ সালের ১২ জানুয়ারি সেখানে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ চালায় জামিয়া ইসলামিয়া ইউনুসিয়ার উত্তপ্ত ছাত্ররা।

সেসময় ঘটে যাওয়া তাণ্ডবে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ স্মৃতি জাদুঘরে সংগৃহীত তাঁর হাতে লেখা অন্তত ২৫টি চিঠি, হজ্ব পালনের সময় সৌদি বাদশাহর দেয়া জায়নামাজ, বৃটিশ শাসনাধীন ভারতের মাইহার রাজ্যের তৎকালীন শাসনকর্তা শ্রী বৃজনাথ সিংয়ের দেয়া রেওয়াজের দুটি গালিচা, তাঁর নিজের একটি বড় ছবি এবং বিভিন্ন সময়ে দেশ-বিদেশের রাষ্ট্রনায়ক, সরকারপ্রধান ও বিশ্ব ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে তোলা অন্তত এক হাজার দুষ্প্রাপ্য আলোকচিত্র ও আলোকচিত্রের অনুলিপি, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর ব্যবহৃত দুটি সরোদ, দুটি বেহালা, একটি সন্তুর, একটি ব্যাঞ্জো ও একটি সারেঙ্গিসহ সেখানে থাকা মূল্যবান প্রায় সবই একেবারে ভস্মীভূত হয়ে যায়।