নদ-নদীর ধাম, ভাওয়াইয়া গানের কুড়িগ্রাম

0
172

খালিদ আহমেদ রাজা :

উত্তর জনপদ ভাওয়াইয়া গানের প্রাণকেন্দ্র। ভাওয়াইয়া গানে বাংলাদেশের মানুষের অন্তর আবহমানকাল ধরে হয়েছে সমৃদ্ধ। ভাওয়াইয়া গান মূলত কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, রংপুর, কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাট অঞ্চলের গান। দোতরা সহযোগে দীর্ঘ লয়ে এ গানগুলো গাওয়া হয়ে থাকে। প্রেম বা ভাবই ভাওয়াইয়া গানের মূল উপজীব্য।
ভাওয়াইয়া গান মানে, আববাস উদ্দীন আহমদ। ভাওয়াইয়া গানে বাংলাদেশের মানুষের অন্তর আবহমানকাল ধরে হয়েছে সমৃদ্ধ। শিল্পী আববাস উদ্দীন আহমদ ভাওয়াইয়া গানকে জনপ্রিয় করে তোলেন। তিনি ভাওয়াইয়া গানকে গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অশিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত মানুষের মুখ থেকে তুলে এনে শহরের শিক্ষিত মানুষের ড্রইংরুমে জায়গা করে দিয়েছিলেন। আববাস উদ্দীন আহমদকে ভাওয়াইয়া গানের পথিকৃত বলা যায়।
কুড়িগ্রামের “বহু ভাওয়াইয়া’র প্রতিষ্ঠাতা সফিউল আলম রাজা”
বর্তমানে এই ভাওয়াইয়া গান কে ধরে রাখার জন্য কুড়িগ্রাম, ও উলিপুরের শিল্পি গুষ্টিরা অনেক চেষ্টা করে যাচ্ছে ।

কুড়িগ্রাম জেলা শিল্পকলা একাডেমীর সাধারণ সম্পাদক রাশেদুজ্জামান বাবু, এই ভাওয়াইয়া গানকে ধরে ধরে রাখার জন্য বিভিন্ন সময় ভাওয়াইয়া গানের অনুষ্টান করে থাকেন। কেন না ভাওয়াইয়া গান কুড়িগ্রাম ও রংপুরের ঐতিহ্য। কুড়িগ্রামের ধরলা ও লালমনির হাটের তিস্তা নিয়ে বেশ কয়েকটি গানও তৈরি করা হয়েছে ও বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে।
বর্তমানে কুড়িগ্রামের অনেক ভাওয়াইয়া শিল্পী রয়েছে।তাদের মধ্যে নামকরা ভাওয়াইয়া শিল্পী মাহবুবুর রহমান মমিন, গোলজার হোসেন ও শফিকুল ইসলাম শফি।

ভাওয়াইয়া গান প্রধানত দুই প্রকার- দীর্ঘ সুর বিশিষ্ট ও চটকা সুর বিশিষ্ট। প্রথম শ্রেণীর গানে নর-নারীর বিশেষত: নব যৌবনাদের অনুরাগ-প্রেম-প্রীতি ও ভালোবাসার আবেদন ব্যক্ত হয়। এরূপ গানের মধ্যে ‘ওকি গাড়িয়াল ভাই’ ‘যেজন প্রেমের ভাব জানে না’ ‘কোন দ্যাশে যান মইশাল বনদূরে’ ‘নউতন পিরিতের বড় জ্বালা’ ‘মেলাতে নিয়ে যাও’ ইত্যাদি অধিক জনপ্রিয়।
কৃষকরা যখন মাঠে কাজ করে, তারা জোড়ালো কন্ঠ দিয়ে ভাওয়াইয়া গান করে থাকে । সাধারণত গ্রাম অঞ্চলে প্রচলিত বেশি । বাংলার ঐতিহ্য এই ভাওয়াইয়া গান। ভাওয়াইয়া গানের সব থেকে মজার বিষয় হলো, এই গানে সুখ, দুঃখ, হাসি, কান্না সব কিছুই আছে । তবে সবার মনে ও অন্তরে এই গান গুন গুন করে বাজতে থাকে।

ভাওয়াইয়া গানের অপর অংশের নাম চট্কা গান। গ্রামে চট্ শব্দের অর্থ তাড়াতাড়ি। চট্কা সুরের ভাওয়াইয়া গান খুব দ্রুত লয়ে গাওয়া হয় বলে এ গান গুলোকে আমরা চট্কা নামে অভিহিত করে থাকি। ভাওয়াইয়া গানে গুরুগম্ভীর বিষয় ও দীর্ঘ টানের সুর ব্যবহৃত হয়, লঘু স্তরের বা চট্কদার বিষয় ও ক্ষিপ্রতালে সুর অবলম্বন করে চট্কা গান রচিত হয়। এ শ্রেণীর গানে যথেষ্ট হাস্যরসের উপাদান থাকে। চট্কা গানের ভিতর দিয়ে সাধারণত দাম্পত্য জীবনের আশা-আকাঙ্ক্ষা মনোমালিন্য, কামনা-বাসনা ও সংসার জীবনের ঘাত-প্রতিঘাতের চিত্র প্রতিফলিত হতে দেখা যায়। ‘ওরে পতিধন বাড়ি ছাড়িয়া না যান’ ‘পানিয়া মর মোক মারিলুরে’ ওরে কাইনের ম্যায়ার ঠসক বেশি/ব্যাড়ায় শালী টাড়ি টাড়ি’ প্রভৃতি গান এ শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত।
বর্তমানে কুড়িগ্রাম, উলিপুর, লালমনির হাট ও রংপুরে এই ভাওয়াইয়া গানের প্রচলিত খুব।