‘বাচ্চার মুখের দিকে তাকিয়ে দুই বছরে পাঁচ লাখ টাকা খরচ কর ফেলেছি। সামনে কত টাকা খরচ করলে বাচ্চা সুস্থ হবে জানি না।’

কথাগুলো বলতে বলতে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি মো. আরেফিন। চাঁদপুরের কচুয়া থেকে তিন বছর বয়সী ছেলে হাসান ইমামকে নিয়ে রাজধানীর শের-ই-বাংলা নগরে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের শিশু বিকাশ কেন্দ্রে এসেছেন তিনি। তিন বছর বয়সেও হাসান হাঁটতে পারে না, নিজে খেতে পারে না। স্বাভাবিক শিশুদের মতো দেখায়ও না।

সন্তানের চিকিৎসার পেছনে দুই বছরে পাঁচ লাখ টাকা খরচ করেছেন আরেফিন। সামনে আরও কত টাকা লাগবে, কতদিন চিকিৎসা চালাতে হবে—কিছুই জানেন না। শুধু জানেন, সন্তানকে সুস্থ করে তুলতে হবে।

আরেফিনের মতো একই লড়াই করছেন কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীর ফাতেমা খাতুন। ১১ মাস বয়সী ছেলে আরাফাতের ঘাড় এখনো শক্ত হয়নি। চোখেও কম দেখে। মাঝেমধ্যে খিঁচুনি হয়। ঠিকমতো খাবারও খেতে পারে না। গ্রামের মানুষের কাছ থেকে ধারদেনা করে সন্তানকে নিয়ে ঢাকায় এসেছেন তিনি।

ফাতেমা বলেন, ‘বাচ্চার ঘাড় শক্ত হয় না, চোখে কম দেখে। অনেক সময় খিঁচুনি হয়। ডাক্তার কইছে মাথায় পানি আছে। রোগ সারতে অনেক সময় লাগবে। ঘাড়ই শক্ত হয় না, হাঁটবে কই থেইকে। খাবারও খেতে পারে না।’

রাজধানীর মিরপুরের ৬০ ফিট এলাকা থেকে ৩৩ মাস বয়সী সন্তানকে নিয়ে শিশু বিকাশ কেন্দ্রে এসেছেন বৃষ্টি রাণী দাশ। শিশুটি হাঁটতে পারে, কিন্তু কথা বলতে পারে না। মাঝেমধ্যে নিজেই নিজের মাথায় আঘাত করে। স্বামী পোশাককর্মী। এক রুমের সংসারে নিত্যদিনের খরচ চালানোই যেখানে কঠিন, সেখানে সন্তানের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও থেরাপির ব্যয় তাদের জন্য হয়ে উঠেছে বাড়তি বোঝা।

‘আজও এক হাজার টাকা খরচ হয়েছে। রিকশা ভাড়া, ওষুধসহ অনেক খরচ। কবে বাচ্চা সুস্থ হবে, এই কথাও কেউ বলতে পারে না’—বলেন বৃষ্টি।

এগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো পরিবারের গল্প নয়। রাজধানীর শিশু বিকাশ কেন্দ্রগুলোর সামনে প্রতিদিন এমন অসংখ্য অভিভাবককে দেখা যায়—কেউ সন্তানকে কোলে নিয়ে, কেউ হুইলচেয়ারে, কেউ আবার এক হাতে রিপোর্টের ফাইল আর অন্য হাতে ওষুধের ব্যাগ নিয়ে অপেক্ষা করছেন। তাদের অনেকের কাছে সন্তানের চিকিৎসা শুধু চিকিৎসার প্রশ্ন নয়; এটি হয়ে উঠেছে পরিবারের আর্থিক টিকে থাকারও প্রশ্ন।

২০-২৫ জন থেকে এখন ৮০-১২০

শিশুর বিকাশ ধাপে ধাপে এগোয়। জন্মের পর প্রথমে ঘাড় শক্ত হয়, এরপর শিশু বসতে শেখে, হামাগুড়ি দেয়, দাঁড়ায় ও হাঁটে। পাশাপাশি ভাষা, চিন্তা, সামাজিক যোগাযোগ ও আচরণগত দক্ষতাও পর্যায়ক্রমে বিকশিত হয়।

কোনো শিশু বয়স অনুযায়ী এসব বিকাশের মাইলফলক অর্জন করতে না পারলে তাকে বিলম্বিত বিকাশ বা ডেভেলপমেন্টাল ডিলের ঝুঁকিতে বিবেচনা করা হয়।

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের শিশু বিকাশ কেন্দ্রের অভিজ্ঞতা বলছে, এ ধরনের সমস্যা নিয়ে আসা শিশুর সংখ্যা গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ছয়-সাত বছর আগে যেখানে দৈনিক ২০ থেকে ২৫ জন শিশু চিকিৎসা নিতে আসত, এখন সেখানে প্রতিদিন ৮০ থেকে ১২০ জন শিশুকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

অর্থাৎ রোগীর চাপ কয়েক বছরের ব্যবধানে কয়েক গুণ বেড়েছে।

শুধু শারীরিক বিকাশ নয়, ভাষা ও সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। জাগো নিউজের ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদনে বর্তমানে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) শিশু নিউরোলজি বিভাগের তথ্য তুলে ধরে বলা হয়েছিল, বিভাগটির বহির্বিভাগে ১০০ রোগীর মধ্যে প্রায় ১০ জনের স্পিচ ডিলে শনাক্ত হচ্ছে। একই সময়ে বাংলাদেশ থেরাপি অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন ফাউন্ডেশনে মাসিক শিশু রোগীর সংখ্যা ২০১৬-১৭ সালের ১০০-১৫০ থেকে ২০২৩-২৪ সালে ৩৫০-৪০০-তে পৌঁছায়।

সন্তানের চিকিৎসায় বিক্রি হচ্ছে জমি-বাড়ি

ডেভেলপমেন্টাল ডিলে আক্রান্ত শিশুর চিকিৎসা অনেক পরিবারের জন্য দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল পথ। থেরাপি, ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, চিকিৎসকের পরামর্শ, যাতায়াত—সব মিলিয়ে মাসের পর মাস, কখনো বছরের পর বছর অর্থ খরচ করতে হয়।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরের দিনমজুর মোহাম্মদ নুরুল ইসলামের পরিবার তার বড় উদাহরণ। ১৪ বছর বয়সী মেয়ে সিফার চিকিৎসা শুরু হয়েছিল তিন বছর বয়সে। ১১ বছর ধরে চিকিৎসার খরচ বহন করতে গিয়ে প্রায় ১২ লাখ টাকা খরচ করেন নুরুল ইসলাম।

এর মধ্যে বাড়ির কিছু অংশ বিক্রি করেছেন। জমিও নেই। কিন্তু সিফা এখনো ঠিকমতো কথা বলতে পারে না, স্বাভাবিকভাবে হাঁটতেও পারে না।

নুরুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘সিফাকে নিয়ে বিপদে পড়েছি। ১২ লাখ টাকা খরচ করেছি। মাঠে জমি নেই। বাড়ির কিছু অংশ বিক্রি করেছি। টাকা গেলে সমস্যা নাই, তাও ভালো হলে শান্তি লাগে। বাচ্চা ঠিক হবে কি না ডাক্তারও বলতে পারেন না।’

এই একটি পরিবারই দেখিয়ে দেয়, দীর্ঘমেয়াদি শিশুচিকিৎসার আর্থিক অভিঘাত কতটা গভীর হতে পারে।

স্পিচ থেরাপি নিতে প্রতি সেশনে (৪৫-৬০ মিনিট) খরচ হয় ৫০০ থেকে এক হাজার টাকা। মাসে ১২টি সেশন নিলে ছয় হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা খরচ হয়।

অকুপেশনাল থেরাপি নিতে প্রতি সেশনে সাধারণত এক হাজার থেকে দুই হাজার টাকা খরচ হয়।

এছাড়া বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বা পেডিয়াট্রিক নিউরোলজিস্টের ভিজিট এক হাজার থেকে তিন হাজার টাকা। প্রাথমিক পূর্ণাঙ্গ অ্যাসেসমেন্ট ফি পাঁচ হাজার থেকে ১৯ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে।

বছরভিত্তিক সম্ভাব্য আনুমানিক খরচ

মাইল্ড বা সাধারণ সমস্যা: সপ্তাহে দু-তিনটি থেরাপি সেশন করালে মাসিক ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা খরচ হবে। বছরে সেই হিসাবে ১ লাখ ২০ হাজার থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা খরচ হবে।

সিভিয়ার বা জটিল সমস্যা: একাধিক থেরাপি যেমন স্পিচ, অকুপেশনাল, বিহেভিয়ার বিষয়ে বিশেষ স্কুল বা আবাসিক কেয়ার প্রয়োজন হলে মাসিক ৩০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা খরচ হতে পারে। রোগের ধরন অনুযায়ী বছরে সাড়ে তিন লাখের বেশি হতে পারে। অন্যান্য রোগের চিকিৎসার সময়সীমা আছে কিন্তু ডেভেলপমেন্ট ডিলে চিকিৎসার কোনো সময়সীমা নেই।

চিকিৎসার শেষ কোথায়, জানেন না কেউ

ডেভেলপমেন্টাল ডিলে চিকিৎসার অন্যতম বড় সমস্যা হলো এর নির্দিষ্ট ‘শেষ সময়’ নেই। কোনো শিশু কয়েক মাসের থেরাপিতে উন্নতি করে, আবার কারও ক্ষেত্রে বছরের পর বছর থেরাপি চালিয়ে যেতে হয়।

নিউরো ডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডার ও অটিজম বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিকাশ কেন্দ্রের চিকিৎসক ডা. তোশিবা রহমান জাগো নিউজকে বলেন, এ ধরনের শিশুদের চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। রোগের ধরন অনুযায়ী থেরাপি, ওষুধ ও পরীক্ষা বাবদ বছরে এক লাখ টাকার বেশি খরচ হতে পারে। শিশুর বয়স বাড়ার সঙ্গে হুইলচেয়ার বা অন্যান্য সহায়ক উপকরণের প্রয়োজন হলে ব্যয় আরও বাড়ে।

তার ভাষায়, ‘এই চিকিৎসা লাইফটাইম। খরচের হিসাব করাটা কঠিন। তবে এটা বলতে পারি অনেক বাবা-মা এই রোগের খরচ আর বহন করতে পারেন না, নিঃস্ব হয়ে যান।’

এই ‘নিঃস্ব হয়ে যাওয়া’ কথাটির বাস্তব চিত্রই পাওয়া যায় নুরুল ইসলামের পরিবারে। আরেফিনের পরিবারেও। বৃষ্টি রাণীর মতো নিম্নআয়ের পরিবারের ক্ষেত্রেও প্রতিদিনের চিকিৎসা ব্যয় সংসারের খাবার, বাসাভাড়া ও অন্যান্য মৌলিক খরচের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে।

ফলে প্রশ্ন উঠছে—দীর্ঘমেয়াদি থেরাপি ও পুনর্বাসনসেবা যদি পরিবারের একার দায়িত্ব হয়, তাহলে দরিদ্র পরিবারের শিশুরা কতটা চিকিৎসা ও থেরাপির সুযোগ পাবে?

কেন থেমে যাচ্ছে শিশুর বিকাশ?

শিশুর বিলম্বিত বিকাশের একক কোনো কারণ নেই। জন্মের আগে, জন্মের সময় কিংবা জন্মের পর বিভিন্ন জটিলতার কারণে শিশুর বিকাশে বিলম্ব হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে ডাউন সিনড্রোমসহ জেনেটিক সমস্যা, হরমোনাল ও বিপাকীয় সমস্যা, মস্তিষ্কের গঠনগত ত্রুটি, জন্মের সময় অক্সিজেনের ঘাটতি, অপরিণত বা কম ওজন নিয়ে জন্ম, সংক্রমণ, খিঁচুনি, জন্ডিস, মাথায় আঘাত এবং অন্যান্য স্নায়ুবিক সমস্যা।

অটিজমসহ বিভিন্ন নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল সমস্যাও শিশুর ভাষা, সামাজিক যোগাযোগ ও আচরণগত বিকাশে প্রভাব ফেলতে পারে।

এখানে আরেকটি বিষয় ক্রমেই আলোচনায় আসছে—শিশুর পরিবেশ।

জাগো নিউজের আগের প্রতিবেদনে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিশু নিউরোলজি বিভাগের বিশেষজ্ঞরা শিশুদের অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহার, একক পরিবারে শিশুর সঙ্গে পর্যাপ্ত সময় না কাটানো এবং সামাজিক মিথস্ক্রিয়া কমে যাওয়াকে ভাষা বিকাশের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ হিসেবে তুলে ধরেন।

তবে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি—সব ডেভেলপমেন্টাল ডিলে বা স্পিচ ডিলের কারণ মোবাইল ফোন নয়। শিশুর সমস্যার পেছনে জেনেটিক, স্নায়ুবিক, শ্রবণজনিত কিংবা অন্যান্য চিকিৎসাগত কারণও থাকতে পারে। তাই শুধু মোবাইল বন্ধ করলেই সমস্যার সমাধান হবে—এমন ধারণা ঠিক নয়।

বরং শিশুর বিকাশে কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে কারণ নির্ণয়ই প্রথম কাজ।

প্রথম তিন বছর—হারানোর সুযোগ নেই

শিশুর জীবনের প্রথম কয়েক বছর মস্তিষ্কের বিকাশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ সময় শিশুর মস্তিষ্ক দ্রুত পরিবর্তিত হয় এবং পরিবেশ থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা, ভাষা, খেলাধুলা, সামাজিক যোগাযোগ ও শেখার সুযোগ তার বিকাশে বড় ভূমিকা রাখে।

ডেভেলপমেন্ট থেরাপিস্ট ফারজানা আক্তার বলেন, শিশুদের স্পিচ ডিলে, শারীরিক ও মানসিক সমস্যা এবং সামাজিক দক্ষতার ঘাটতি নিয়ে থেরাপি দেওয়া হয়। শিশুর বয়স অনুযায়ী কথা বলা, হাঁটাচলা, সামাজিক মেলামেশা ও চিন্তার ক্ষমতা ঠিকভাবে বাড়ছে কি না, তা বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মূল্যায়ন করা হয়।

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের শিশু বিকাশ কেন্দ্রের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) আহমেদ আসিফ ফেরদৌস জাগো নিউজকে বলেন, শিশুর বিকাশে বিলম্ব দেখা দিলে দেরি না করে এর কারণ নির্ণয় করা জরুরি। প্রয়োজনে শিশু নিউরোলজিস্টের পরামর্শ নিতে হবে।

কারণ শনাক্ত করা গেলে প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধ, ডেভেলপমেন্টাল থেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি, স্পিচ থেরাপির মাধ্যমে শিশুকে বিকাশের বিভিন্ন ধাপে পৌঁছাতে সহায়তা করা যায়।

এখানেই আসে ‘আগে শনাক্তকরণ’র গুরুত্ব।

একটি শিশু তিন বছর বয়সে কথা না বললে ‘বড় হলে ঠিক হয়ে যাবে’ ভেবে আরও দু-তিন বছর অপেক্ষা করা মানে তার গুরুত্বপূর্ণ বিকাশকাল থেকে কয়েকটি বছর হারিয়ে ফেলা হতে পারে।

কোন লক্ষণে অভিভাবক সতর্ক হবেন?

প্রতিটি শিশুর বিকাশের গতি এক নয়। একই পরিবারের দুই শিশুও একই সময়ে একই মাইলফলকে পৌঁছাবে—এমন কোনো নিয়ম নেই। তবে বয়স অনুযায়ী মৌলিক কিছু বিকাশের ধাপ রয়েছে।

সাধারণভাবে বেশির ভাগ শিশু তিন মাসের দিকে মাথা তুলতে শুরু করে, ছয় মাসের দিকে বসার চেষ্টা করে এবং ১৮ মাসের মধ্যে হাঁটা শুরু করে। ভাষার ক্ষেত্রেও ধাপে ধাপে পরিবর্তন আসে।

ছয় মাসের দিকে শিশু অর্থহীন শব্দ বা বাবলিং করতে শুরু করে। ৮-১২ মাসে ছোট অর্থবোধক শব্দ বলতে শুরু করে। দুই বছর বয়সের দিকে দুটি শব্দজুড়ে ছোট বাক্য বলার সক্ষমতা তৈরি হয়।

এর বাইরে নিচের লক্ষণগুলোও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার—

  • বয়স অনুযায়ী মাথা ধরে রাখতে না পারা
  • বসতে, দাঁড়াতে বা হাঁটতে দেরি হওয়া
  • ডাকলে সাড়া না দেওয়া
  • চোখে চোখ রেখে কথা বা যোগাযোগ না করা
  • খেলনা ধরতে বা ব্যবহার করতে না পারা
  • বয়স অনুযায়ী কথা না বলা
  • অন্যের কথা বা নির্দেশনা বুঝতে সমস্যা
  • নিজে খেতে বা দৈনন্দিন কাজ করতে না পারা
  • সামাজিকভাবে অন্য শিশু বা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মিশতে না চাওয়া
  • অস্বাভাবিক আচরণ বা নিজের শরীরে আঘাত করার প্রবণতা

ভাষা বিকাশের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট মাইলফলক রয়েছে। জাগো নিউজের আগের প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞদের তথ্যমতে, চার-ছয় মাসে শিশুরা বিভিন্ন ধ্বনি উচ্চারণ শুরু করে; ৯-১৮ মাসের মধ্যে প্রথম অর্থবোধক শব্দ আসে এবং দুই বছর বয়সের দিকে প্রায় ৫০টি শব্দ বলার পাশাপাশি দুই শব্দের ছোট বাক্য ব্যবহার শুরু করতে পারে।

চিকিৎসা শুধু পরিবারের দায়িত্ব কেন?

বাংলাদেশে ডেভেলপমেন্টাল ডিলে বা নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল সমস্যায় আক্রান্ত শিশুর চিকিৎসা ও পুনর্বাসনসেবা নিয়ে সচেতনতা বাড়ছে। কিন্তু সেবার সুযোগ, দক্ষ জনবল এবং ব্যয় বহনের সক্ষমতার মধ্যে বড় ব্যবধান রয়ে গেছে।

জাগো নিউজের আগের প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাংলাদেশ থেরাপি অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন ফাউন্ডেশনে মাসিক শিশু রোগীর সংখ্যা ২০১৬-১৭ সালের তুলনায় ২০২৩-২৪ সালে কয়েক গুণ বেড়েছে। একই সঙ্গে স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্টের সংখ্যাও বেড়েছে। কিন্তু রোগীর চাপের তুলনায় সেবা কতটা পর্যাপ্ত, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি বৈশ্বিক হিসাবও দেখায়, পাঁচ বছরের কম বয়সী কোটি কোটি শিশু বিকাশজনিত সমস্যার ঝুঁকিতে রয়েছে এবং এর বড় অংশ নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে বাস করে।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় তাই প্রয়োজন তিনটি স্তরে কাজ করা।

প্রথমত, দ্রুত শনাক্তকরণ। শিশুর বিকাশে বিলম্ব হলে স্থানীয় পর্যায়েই তা শনাক্ত করার ব্যবস্থা করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, সহজলভ্য থেরাপি। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কম খরচে স্পিচ, অকুপেশনাল ও ডেভেলপমেন্টাল থেরাপির সুযোগ বাড়াতে হবে।

তৃতীয়ত, আর্থিক সহায়তা। নিম্নআয়ের পরিবারকে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন ব্যয়ে সহায়তার ব্যবস্থা না করলে অনেক শিশু মাঝপথে চিকিৎসা থেকে ছিটকে পড়বে।

কারণ চিকিৎসা শুরু করাই যথেষ্ট নয়; নিয়মিত চালিয়ে যাওয়াও জরুরি।

আরেফিনের পাঁচ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। নুরুল ইসলামের ১২ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। ফাতেমা টাকা ধার করে ঢাকায় এসেছেন। বৃষ্টি জানেন না, আগামী মাসের থেরাপির টাকা কোথা থেকে আসবে।

তবু তারা থামছেন না। কারণ প্রত্যেকের চোখে একই স্বপ্ন—সন্তান একদিন হাঁটবে, কথা বলবে, নিজের কাজ নিজে করবে।

কিন্তু সেই স্বপ্নের পথে যদি প্রতিটি পরিবারকে নিজের জমি বিক্রি করতে হয়, ধারদেনায় ডুবতে হয় কিংবা চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে সংসারের মৌলিক চাহিদা কমিয়ে দিতে হয়, তাহলে এটি আর শুধু একটি পরিবারের সমস্যা থাকে না; এটি জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।

ডেভেলপমেন্টাল ডিলে আক্রান্ত শিশুর জন্য সময় গুরুত্বপূর্ণ। যত দ্রুত সমস্যা শনাক্ত করা যায়, তত দ্রুত প্রয়োজনীয় সহায়তা শুরু করা সম্ভব। আর যত দ্রুত সহায়তা শুরু হবে, শিশুর সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর সুযোগও তত বেশি থাকবে।

তাই প্রশ্নটি শুধু ‘শিশু কখন স্বাভাবিক হবে’—এমন নয়। প্রশ্ন হওয়া উচিত—একটি শিশুর সম্ভাবনাকে বিকশিত করতে রাষ্ট্র, স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও সমাজ কতটা সহায়তা দিতে প্রস্তুত?

কারণ একটি শিশুর বিকাশ থেমে গেলে শুধু তার শৈশবই আটকে যায় না; দীর্ঘ চিকিৎসার বোঝায় কখনো কখনো থমকে যায় পুরো একটি পরিবারও।