চিলমারীর কৃষক মাঠে ফসল ফলান, ঘামে ভেজান মাটি। কিন্তু সেই ফসলের একটি বড় অংশ যখন বাজারে ওঠে, তখন শুরু হয় আরেক লড়াই—ন্যায্যমূল্য পাওয়া, সংরক্ষণ করা এবং প্রক্রিয়াজাত করে ভালো দামে বিক্রি করার লড়াই।

এই লড়াই কিছুটা সহজ করার স্বপ্ন নিয়েই চিলমারীতে নির্মাণ করা হয়েছিল কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ কেন্দ্র। প্রায় ছয় কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত কেন্দ্রটিতে বসানো হয়েছে নানা ধরনের আধুনিক মেশিন। কিন্তু নির্মাণ শেষ হওয়ার পর কেটে গেছে প্রায় চার বছর। কৃষকের কাজে এখনো পুরোপুরি চালু হয়নি কেন্দ্রটি।

একদিকে আধুনিক যন্ত্রপাতি, অন্যদিকে নীরবতা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মূল্যবান মেশিনপত্র নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।

যে কেন্দ্র বদলে দিতে পারত কৃষকের গল্প

একজন ছোট উদ্যোক্তা এই কেন্দ্রের মাধ্যমে ধান, গম ও সরিষা ভাঙাতে পারবেন। মসলা গুঁড়া করা, চিপস ও বেকারি পণ্য তৈরি, ফলের জুস উৎপাদন কিংবা দুধ থেকে দই তৈরির সুযোগও রয়েছে। মাছ ও মাংস সংরক্ষণের ব্যবস্থার পাশাপাশি রয়েছে কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের সুবিধা।

অর্থাৎ মাঠের কৃষিপণ্য শুধু কাঁচা অবস্থায় বিক্রি না করে প্রক্রিয়াজাত করে বাজারজাত করার সুযোগ তৈরি হওয়ার কথা ছিল এখানে।

এতে কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের মূল্য বাড়তে পারত। একই সঙ্গে স্থানীয়ভাবে তৈরি হতে পারত ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র। কিন্তু সম্ভাবনার সেই দরজা এখনো পুরোপুরি খোলেনি।

চার বছর পরও অপেক্ষা

কুড়িগ্রাম জেলার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্য হ্রাসকরণ প্রকল্পের আওতায় পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (আরডিএ), বগুড়া ২০১৮ সালে জেলার চারটি উপজেলায় এমন কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের আর্থিক সহায়তায় চিলমারীতে ২০২২-২৩ অর্থবছরে কেন্দ্রটির নির্মাণ প্রক্রিয়া শেষ হয়।

এরপর কেটে গেছে একের পর এক বছর।

কৃষক ও উদ্যোক্তাদের প্রত্যাশা ছিল—কেন্দ্রটি চালু হলে স্থানীয় কৃষিপণ্যের প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হবে। কিন্তু সেই প্রত্যাশা এখনো অপেক্ষার তালিকায়।

কবে চালু হবে?

কেন্দ্রটি চালুর নির্দিষ্ট সময় জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সমবায়ভিত্তিক সমিতি, এনজিও অথবা আগ্রহী উদ্যোক্তার কাছে কেন্দ্রটি লিজ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

রংপুর পল্লী উন্নয়ন একাডেমির পরিচালক (প্রশিক্ষণ) জাহেদুল হক চৌধুরী বলেন, “অল্প সময়ের মধ্যে টেন্ডারের মাধ্যমে লিজ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।”

তবে ‘অল্প সময়’ কতটা—সেই প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর এখনো নেই।

স্বপ্নের কেন্দ্র, বাস্তবায়নের অপেক্ষা

চিলমারীর কৃষকের জন্য এই কেন্দ্র কেবল একটি ভবন নয়; এটি হতে পারে উৎপাদিত পণ্যের মূল্য সংযোজন, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরি এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে গতিশীল করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

কিন্তু কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত অবকাঠামো যদি বছরের পর বছর কার্যক্রমহীন পড়ে থাকে, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—উন্নয়নের জন্য তৈরি করা কেন্দ্রটি কবে উন্নয়নের কাজে আসবে?

কৃষকের মাঠে ফসল ফলছে, উদ্যোক্তার আগ্রহও আছে। মেশিনও বসানো হয়েছে। এখন প্রয়োজন শুধু কার্যকর উদ্যোগ।

চিলমারীর মানুষ তাই অপেক্ষায়—ছয় কোটি টাকার এই সম্ভাবনার কেন্দ্রের দরজা কবে খুলবে?