জব্বারের স্বপ্নই ছিলো মেডিকেলে ভর্তি

0
2

রেদ্ওয়ান আহমদ, চবি প্রতিনিধি:   ১৯৭১ সালের ২৫ই মার্চ কালো রাতে অপহৃত ঢাকা মেডিকেল কলেজের প্রফেসর ডাক্তার ও বুদ্ধিজীবী ডা. আব্দুল আলিম চৌধুরীর মৃত্যুর ৫০ বছর পর এই প্রথম তারই গ্রাম খয়েরপুর থেকে কেউ একজন ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেলো। মেডিকেলে ভর্তি

কিশোরগঞ্জ জেলার মিঠামইন উপজেলার খয়েরপুর গ্রামের মো. রহমত আলীর বড় ছেলে আব্দুল জব্বার। যার পড়ালেখার হাতেখড়ি হয় বাড়ির পাশে সরকারি প্রাইমারি স্কুলে। কিন্তু খয়েরপুর গ্রামে কোনো হাইস্কুল না থাকার কারণে তাকে প্রাইমারির পাঠ শেষে ভর্তি হতে হয় পার্শ্ববর্তী গ্রামের হাইস্কুল ‘কাদিরপুর এস.এম.নাথ উচ্চ বিদ্যালয়ে।

অতঃপর ২০১৮ সালে এই হাইস্কুল থেকেই বিজ্ঞান বিভাগ হতে জিপিয়ে ৫.০০ পেয়ে এসএসসি পাশ করে জব্বার। কিন্তু ইন্টারমেডিয়েটে কোথায় ভর্তি হবে তা নিয়ে দ্বিধায় পড়ে যায় সে। তার পরিবার বা বংশে কারোরই ছিলো না প্রাতিষ্ঠানিক কোনো শিক্ষা। কিন্তু তার ইচ্ছে, সে ডাক্তার হবে। তাই, সে ভর্তি হতে চায় দেশের নামকরা কোনো প্রতিষ্ঠানে।

যে গ্রাম থেকে উচ্চ শিক্ষার স্বপ্ন দেখা নিতান্তই সৌখিনতা, সেখানে ডাক্তার হওয়া এক অলীক কল্পনা যেনো। তবুও দুঃসাহস দেখিয়ে জব্বার ভর্তি পরীক্ষা দেয় ঢাকা নটরডেম কলেজে। কারণ, তার স্বপ্নই যে ছিলো মেডিকেল। ভালো কোনো প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে না পারলে যে তার সে স্বপ্নটা মরে যাবে। তাই, এই অজপাড়া গাঁ থেকেও তার এই দুঃসাহস।

এবং সফলতার সাথে উত্তীর্ণও হয় সে। এরপর জব্বার পাড়ি জমায় সুদূর অচেনা অজানা শহর ঢাকায়। অদম্য ইচ্ছেশক্তি ও কঠোর পরিশ্রমের পর ইন্টারমেডিয়েটে বিজ্ঞান বিভাগ হতে আবারও জিপিয়ে ৫.০০ পেয়ে পাশ করে জব্বার। তারপর করোনার থাবায় পড়েও পিছপা হয়নি জব্বার। অসংখ্য বাধা-বিপত্তির পর প্রায় একবছর পর তার সামনে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ।

কতোশতো নির্ঘুম রাত পাড় করে সে তার জানা নেই। অবশেষে মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষা দেয় সে। এমনকি স্বপ্নপুরির মতো সারাদেশে জাতীয় মেধা তালিকায় ৮৫ তমো হয়ে যায়। আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়ে জব্বারের পুরো পরিবার।

যা খয়েরপুরবাসীর জন্য এক ঈদ হয়ে ধরা দেয়। ডা. আব্দুল আলিম চৌধুরীর উত্তরসূরী যেনো। খয়েরপুর এমন এক গ্রাম যেখানে কোনো হাইস্কুল নেই। পাশের গ্রামে যেয়ে পড়তে হয়। সেখানেও নেই শহরের তুলনায় ভালো মানের কোনো শিক্ষক।

এমনকি এটি এমন এক প্রত্যন্তঅঞ্চল যার সাথে শহরের কোনো রাস্তা বা যোগাযোগ ব্যবস্থা নেই। কারেন্ট কোনোরকম থাকলেও নেই গ্যাস ব্যবস্থা। যেখানের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ হলো মেট্রিক পাশ। যে এলাকার অধিকাংশ ছাত্র-ছাত্রীরা ঝরে পড়ে তারও আগে। লেগে যায় আয়-রোজগারে, চলে যায় বিদেশে। আর মেয়েরা চলে যায় অপ্রাপ্ত বয়সেই শ্বশুর বাড়ি।

যেখান থেকে জব্বারের এই সফলতার পথটা ছিলো দুর্গম। এই অজপাড়া গাঁ থেকে মেডিকেলে পড়তে পারা যেনো স্বপ্নের রাজকুমারীর দেখা পাওয়া। তবুও সে তার কঠিন অধ্যাবসায় ও পরিশ্রমের মাধ্যমে জয় ছিনিয়ে এনেছে। অতঃপর সে এখন মেডিকেলের ছাত্র।