শীতের আমেজ ছড়িয়ে পড়ুক সবার মাঝে

0
18

হেমন্তকাল যেন শীতের আগমনী বার্তা নিয়ে আসে । সোনালী হেমন্ত শেষ হতে না হতেই চলে এসেছে শীতকাল। কবি সুফিয়া কামাল রচিত এই পঙক্তিগুলো আমাদের স্মরণ করে দেয় যে শীতের সকাল কতোটা উপভোগের , “সকাল বেলা শিশির ভেজা / ঘাসের উপর চলতে গিয়ে / হালকা মধুর শীতের ছোঁয়ায় / শরীর উঠে শিরশিরিয়ে” — মুক্তোর দানার মতো চকচক করতে থাকা দূর্বাঘাসের উপর বিন্দু বিন্দু শিশির ফোঁটা যখন অলস ঘুমিয়ে থাকে ঠিক তখনই পদতলের ছোঁয়ায় পতন ঘটলে মানব শরীরে শিরশির ছন্দ বয়ে যায় । শরীরের লোমগুলোরও ঘুম ভাঙ্গে , সাথে মোহিত করে মনকে । অন্যরকম একটা অনূভূতি মনের মধ্যে দোলা দিয়ে যায় । সেই সাথে খেজুর রসের মিষ্টি গন্ধ , ঝিরঝিরে বাতাসের সাথে তাল মিলিয়ে গাছের পাতা বেয়ে শিশির ফোঁটা পড়ার টুপটাপ শব্দ , আর পাখির কিচিরমিচির কলরব পরিবেশকে উপহার দেয় এক অপরূপ সুমধুর ধ্বনিব্যঞ্জনা । কুয়াশার চাদর মোড়ানো খোলা আকাশের নিচে সীমাহীন সারি সারি সরিষার ক্ষেত যেন হলুদের মহাসাম্রাজ্য । আহা, কী অপরূপ মনোমুগ্ধকর প্রকৃতি ! গাড়ির হর্ন , বিকল ইঞ্জিনের বিকট শব্দ , হাজারো মানুষের কোলাহলমুক্ত একমাত্র গ্রামীণ পরিবেশইতো শীতের আমেজকে প্রস্ফূটিত করে , শরীর ও মনকে করে শতভাগ পুলকিত । শীতের সকাল মানেই ছোটবেলার হাতছানি । উনুনের পাশে বসে ভাপা পিঠার আশায় আগুনের গরম উষ্ণতা আন্দোলিত করে মনকে । শীতের দিন প্রতিটা পাড়া মহল্লায় চলে অঘোষিত পিঠাপুলির উৎসব । গ্রামের মেয়েরা গোল হয়ে বসে ঐতিহ্যবাহী গল্পের আসর জমায় আর হাতে চলে হরেক রকম পিঠা বানানোর কাজ । বধূরা সকাল হতেই পিঠার পসরা সাজিয়ে পরিবেশনের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে । চিতই পিঠা , পুলি পিঠা , তেল পিঠা , পাটিসাপটা , মালাই ঠাসা বা ফাঁপা । আরও কত কী ! এর সাথে জামাই মেয়ের আগমনে বাড়ি হয়ে উঠে সরগরম ।
জড়তা আর বিরক্তির সংস্পর্শে শীত হলো অলসতার আঁতুড়ঘর । আলস্যের চাদর আর কুয়াশার বুক চিড়ে পুবের জানালা দিয়ে সূর্য মামা উঁকি দিলেও শীতের সকালে লেপ মুড়ি দিয়ে ওম নিতে কার না ভালো লাগে। তবে শীতের সকাল সবার ক্ষেত্রে আলসেমি নয় । হতদরিদ্র , দিনমজুর , খেটে খাওয়া মানুষগুলোর জড়তা আর অলসতায় ডুবে থাকলে তাদের চলে না । পেটের টানে হাড় কাঁপুনে শীত উপেক্ষা করে কৃষকরা ফসল ফালাতে ব্যস্ত সময় পার করে । শিশু এবং বৃদ্ধ মানুষগুলো অতিরিক্ত শীতে ঠকঠক করে কাঁপে । অতিরিক্ত ঠান্ডায় বাস্তুহারা , পথশিশু , মানসিক ভারসাম্যহীন মানব সমাজ অবর্ণনীয় যাতনা ভোগ করে । প্রান্তিক মানুষগুলো অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল হওয়ায় শীতের পোশাক জোগাড় করতে অপারগ হয় । ঠান্ডা হওয়া হয়ে যায় তাদের নিত্যসঙ্গী । ফলে তারা বিভিন্ন রকম রোগ বালাই দ্বারা আক্রান্ত হয় । বিভিন্ন সংগঠন এবং দাতব্য সংস্থা যখন গরম বস্ত্র দুঃস্থ মানুষের মাঝে বিলিয়ে দেয় তখন সেখানে উৎসবের আমেজ তৈরি হয় । মানুষের ফাঁটা ঠোঁটে এক চিমটি হাসি দেখা দেয় । তবে দেশের নানা অঞ্চলের নানা স্বেচ্ছাসেবী ও সামাজিক সংগঠনগুলোর কার্যক্রম যথাযথ নয় । স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর পাশাপাশি বিত্তবান মামুষদেরকে সরকারি ও ব্যক্তি উদ্যোগে গরীব ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো উচিত । পাড়া মহল্লার সবাইকে নিয়ে বিভিন্ন পঞ্চায়েত কমিটি গঠন করে গরীব – দুঃখীদের শীতের বস্ত্রের ব্যবস্থা করে দেওয়া উচিত । মানবতার দেয়াল তৈরি করে পোশাক প্রদানের মাধ্যমে মানুষের কষ্ট লাঘবের যথাসাধ্য চেষ্টাও অব্যাহত রাখা যায় । এতে আশা করা যায় সব শ্রেণী পেশার মানুষ ভেদাভেদ ভুলে শীতের আমেজ সবার মাঝে ছড়িয়ে পড়বে । আসুন, শীতকে সর্বস্তরে আনন্দদায়ক ও উপভোগ্য করতে আমরা সবাই সাধ্যমতো পথশিশু , অসহায় এবং গরীব মানুষদের পাশে দাঁড়াই ।

মোঃ ইউনুস আলী
শিক্ষক,
গহেলাপুর নবাব মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয়।
রাণীনগর, নওগাঁ।