
আমরা আসলে সবাই এক সেলুকাসের দুনিয়ায় বাস করি। কেন কথাটা বললাম, কারণ আমরা সারাদিন যা বলি বা বিশ্বাস করি বাস্তবে তা করার জন্য তেমন আগ্রহী না। আমরা সবাই জানি একদিন মরতে হবে, কিয়ামত আছে, হাশর আছে, জান্নাত আছে, জাহান্নাম আছে; আখিরাতের জীবন অনন্তকালের, সেখানে কোন মৃত্যু নাই। কিন্তু আমাদের কাজ বা আচরণে তা প্রকাশ পায় না।
কেউ যদি ব্যবসায়ী বা খেলোয়াড় হয় তাহলে সে সারাদিন তার কাজ নিয়ে কথা বলে এবং সেই অনুযায়ী কাজ করে। ব্যবসায়ী কখনো এমন কাজে সময় নষ্ট করে না যার ফলে ব্যবসার ক্ষতি হয়। তেমনি খেলোয়াড় সারাদিন খেলা নিয়ে ব্যস্ত থাকে এবং তার সমস্ত চিন্তা ঐ কাজে ব্যয় করে।
সুতরাং মানুষ যা বিশ্বাস করে তার কাজ-কর্মে তার প্রতিফলন ঘটে। আমরা মুসলমান। আমরা সবাই বিশ্বাস করি যে, একদিন মারা যেতে হবে; আর আখিরাতের জীবনের যাত্রার শুরু আছে কিন্তু শেষ নেই। কিন্তু আমাদের দৈনন্দিন কাজকর্মে তার প্রতিফলন খুব একটা দেখা যায় না।
কাউকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয় ভাই আপনি তো মুসলমান আপনি নামাজ পড়ার ফযীলত জানেন? সে বলবে, জানি। নামাজ না পড়ার শাস্তি কি? সে বলবে এক ওয়াক্ত নামাজ না পড়লে ১ কোটি ৮৮ লক্ষ বছর জাহান্নামের আগুনে জ্বলতে হবে । কিন্তু নামাজ পড়েন না কেন? সে তখন নানা অজুহাত দেখাবে বা বলবে— পড়ব, পরে। কিন্তু আসল কারণ নামাজ পড়ার প্রতি তার একীন এখনো তৈরি হয় নাই। আসলেই যদি নামাজের প্রতি তার ঈমান থাকত আর নামাজের ফযীলত আর শাস্তির বিধানের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস থাকলে সে কখনো নামাজ ত্যাগ করতে পারতো না।
আমরা সবাই জানি আগুনে হাত দিলে হাত পুড়ে যায়। এই বিশ্বাস আমাদের মধ্যে এত শক্ত যে, আগুন দেখলেই লাফ দেই। কোন অন্ধকে যদি বলা হয়, ভাই সামনে সাপ! পা দিলে কামড় খাবেন তাহলে সে কি বলবে— এই তো ভাই, পরে সরতেছি? নাকী পরি কি মরি বলে দৌড় দেবে?
আর আমরা নামাজের সময় অন্য কাজ করি কিন্তু নামাজ পড়তে পারি না— তার মানে আমাদের ভেতরে নামাজের প্রতি বিশ্বাস ভালভাবে তৈরি হয়নি। আমাদের কালবে দুনিয়ার প্রতি ভালোবাসা বদ্ধমূল আর তাই সেখানে এখনো আখিরাতের বুঝ আসেনি। আসলে আমরা মৃত্যুর জন্য এখন প্রস্তুত না। আরে ভাই আপনি কি জানেন, মালাকুল মউত কখন আসবে? আর যদি এখন আসে তখন কি বলবেন, একটু পরে আসেন, নেক আমলগুলো করে নেই?
মনে করেন কোন লোকের খবর আসলো ২ দিনের মধ্যে সে দুবাই/আমেরিকা যেতে পারবে তাহলে সে কি চুপ করে বসে থাকবে? বরং সে পাগলের মত তার জিনিসপত্র গোছাতে শুরু করবে আর দেখা যাবে ফ্লাইট ছাড়ার অনেক আগে সে রেডি। অথচ সে ওইখানে মাত্র কয়েকদিনের জন্য যাচ্ছে আর তার জন্য গোছগাছের শেষ নাই। আর যদি আমাকে বা আপনাকে জিজ্ঞাসা করা হয়, আপনি মারা গেলে কতদিন পর আসবেন? তখন বলা হবে, আপনি তো ভাই মহাউল্লুক। মরার পর কেউ কি ফিরে আসে? এখন ওই উল্লুক যদি পাল্টা প্রশ্ন করে— তাহলে সেই মহাযাত্রার জন্য কি মাল-পত্র গোছালেন? মনে এর উত্তর আর পাওয়া যাবে না।
আরে ভাই, দুনিয়ার অল্প কয়দিন যাত্রার জন্য আমাদের এত প্রস্তুতি আর যেখানে অনন্তকালের জন্য যাব তার কোন খবরই নাই। তাহলে বলেন কে উল্লুক?
আমাদের কাজ দ্বারা আমাদের নিয়ত আর বিশ্বাস প্রকাশ পায় না। আমরা বলি খারাপ কাজ করলে জাহান্নামে যাওয়া লাগবে, আগুনে পোড়া লাগবে, যেটা দুনিয়ার থেকে ৭০ গুণ শক্তিশালী। আমরা সেই দুনিয়ার আগুনে ১ সেকেন্ড হাত রাখতে পারি না, আর অবলীলায় খারাপ কাজ করছি। বলুন তাহলে, আসলে কি আমাদের মনে জাহান্মামের ভয় আছে?
আমরা বলি— আল্লাহ সবকিছু দেখেন, শোনেন। আমাদের মনে আসলেই কি এর ঈমান আছে। মনে করুন, একটা চোর যদি পুলিশ দেখে সে কি খারাপ কাজ করার সাহস পায়? পায় না। শিক্ষক সামনে দাঁড়ালে ছাত্র কি নকল করার সাহস পায়? পায় না।
আর আমি আপনি বলি যে, আল্লাহ সব দেখেন, সবখানে আছেন আর দেদারসে খারাপ কাজ করতে থাকি। চোরের মন চুরি করতে চাইলেও সে পুলিশের ভয়ে তা করে না, ছাত্রের মন নকল করতে চাইলেও সে শিক্ষকের ভয়ে নকল করতে পারে না। আর আমাদের মনে যদি আল্লাহর ভয় আসলেই থাকত তাহলে খুন হয়ে গেলেও আমরা সেই কাজ করতাম না, যেটা আল্লাহ পছন্দ করেন না। আমাদের আসলে অন্তরে ঈমান আসলে আসে নাই। আমাদের সব দাবী আসলে মৌখিক।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন,
‘হে রাসূল, তাদের জন্যে দুঃখ করো না, যারা দৌড়ে গিয়ে কুফরে পতিত হয়; যারা মুখে বলে—আমরা মুসলমান, অথচ তাদের অন্তর মুসলমান নয়।’ (৫:৪১)
‘মরুবাসীরা বলে: আমরা বিশ্বাস স্থাপন করেছি। বলো: তোমরা বিশ্বাস স্থাপন করনি; বরং বলো, আমরা বশ্যতা স্বীকার করেছি। এখনও তোমাদের অন্তরে বিশ্বাস জন্মেনি। যদি তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর, তবে তোমাদের কর্ম বিন্দুমাত্রও নিষ্ফল করা হবে না। নিশ্চয়, আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম মেহেরবান।’ (৪৯:১৪)
সুতরাং মুখে বললেই ঈমানদার হওয়া যায় না। প্রকৃত মুসলমান হলো সেই ব্যক্তি, সে যা বিশ্বাস করে সে অনুযায়ী কাজ করে। কেউ যদি নিজেকে খেলোয়াড় দাবী করে, আর সারাদিন ঘুমায়, তাহলে তাকে কি খেলোয়াড় বলবে কেউ? কেউ যদি দাবী করে সে ভালো ছাত্র, আর সে সারাদিন ঘোরাফেরা করে, সে কি ভালো ছাত্র?
আমরা দাবী করি আমরা ঈমানদার, আর করি উল্টা কাজ, তাহলে আমরা কি ধরনের ঈমানদার?






