

আরাফাত রহমান, জেলা প্রতিনিধি, রাজবাড়ী:
সেদিন গ্রামের এক রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম। হাঁটতে হাঁটতে অনেক কিছুই খেয়াল করলাম, যা নিতান্তই আমাকে ভাবিয়ে যায়। কিছুদুর হাঁটার পর খেয়াল করলাম এক আন্টি একটা লোকের সাথে গল্প করছে। আমার তো সাংবাদিকের মন, চুপি চুপি তাদের কথা শুনতে লাগলাম।
আন্টিটা লোকটাকে বলছে, আমার মেয়ে অনেক ভালো, অনেক ঘরোয়া, বাড়িতে সবার খাওয়া শেষে খায়, সবথেকে ছোট মাছটা খায়, ইত্যাদি ইত্যাদি। কিছুক্ষন তাদের কথা শোনার পর বুঝলাম লোকটি আসলে ঘটক।
যে মেয়েটিকে নিয়ে আলোচনা হচ্ছে তার নাম মীম। এবার অষ্টম শ্রেনী থেকে নবন শ্রেনীতে উঠেছে। চলছে ঘটক মহাশয় আর মীমের মায়ের কথা বার্তা।
ঘটক মহাশয় মেয়েটির মায়ের কাছ থেকে মেয়ের সম্পুর্ন বিবরন নিচ্ছেন। সবকিছু বিবরন নেওয়া শেষে ঘটক মহাশয় মেয়েটির মাকে একটা ছেলের ছবি দেখিয়ে বললেন, ছেলেটি অনেক ভদ্র, অনেক ভালো, সরকারি চাকরি করে, আপনার মেয়ে ভালো থাকবে।
সবকিছু শুনে ও ছেলেটিকে দেখে মোছাঃ জাহানারা (মীমের মা) তো মহাখুশী। ওই ছেলের সাথেই মেয়ের বিয়ে দিবে। আম স্বাভাবিল দৃষ্টিতেই তাদের দিকে তাকিয়ে ছিলাম আর মনোযোগ দিয়ে তাদের কথা শুনছিলাম।
কথাপকথনের এক পর্যায়ে শুনলাম ছেলেপক্ষ নাকি ২ লক্ষ টাকা যৌতুক ছাড়া বিয়ে করবে না। এটা শুনে একটু অবাক হলাম। এর থেকেও বেশি অবাক হলাম যখন মেয়েটির মা রাজি হয়ে গেলো। তাহলে পরিস্থিতি দাঁড়ালো, প্রথমত বাল্যবিবাহ, দ্বিতীয়ত যৌতুক। কি জানি, মেয়েটার মন আছে কিনা বিয়েতে?
এইসব ভাবতে ভাবতেই সেখান থেকে বিদায় নিলাম। একটা সময়ে মনে হলো সাংবাদিক হিসাবে আমার কিছু একটা করা উচিৎ। ভাবলাম এলাকার মেম্বারের কাছে বিষয়টা বলে দেখি। কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম, কালকের সেই ঘটকটিই আসলে এলাকার মেম্বার। কি আর করার থাকে তখন? যেখানে একজন জনপ্রতিনিধি এরকম একটা অসামাজিক কার্মকান্ডের সাক্ষী।
অনেক ধুমধাম করে, ২ লক্ষ টাকা যৌতুক দিয়ে, মেয়েটির মতের বিরুদ্ধেই বিয়ের আয়োজন করা হলো। তখনও আমি নিরব দর্শক। সবথেকে খারাপ লাগলো যে বিষয়টি, সেটা হলো এই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সাহেবও বিয়ের দাওয়াতের মেহমান। সবকিছু জানার পড়েও তিনি স্বাভাবিকভাবেই চলে এসেছেন দাওয়াত রক্ষা করতে। কোনো হস্তক্ষেপ নেই তার বিয়েতে। হয়তো নির্বাচন সামনে তাই।
আমিও স্বাভাবিকভাবেই দাওয়াতের খাবার খেয়ে বাইরে ঠান্ডা বাতাসে দাঁড়িয়ে আছি। হঠাৎ বাড়ির ভিতরে কান্নাকাটির আওয়াজ শুনতে পেলাম। এটা তো বিয়ের কান্না না। ভিতরে গিয়ে দেখলাম মেয়েটি সিলিং ফ্যানের সাথে ঝুলে আছে। হাতে আত্নহত্যার নোটিশ।
বিয়েবাড়িটা এক মুহুর্তে কান্নাকাটিতে ভেঙে পড়লো। আমি নিজের কাজ করতে ব্যাস্ত। হঠাৎ মেয়েটির মা কাঁদতে কাঁদতে বললো, তুমি সাংবাদিক, আগে থেকেই জানো যৌতুক দেওয়া হচ্ছে, বাল্যবিয়ে, তাও কেন আটকানর চেস্টা করলে না?
আমি নিরবে বিদায় নিলাম। কিন্তু একটা প্রশ্ন থেকেই যায়, ঘটনাটির জন্য সত্যিই কি কোনোভাবে আমি দায়ী? নাকি সমাজের মুখোশধারী কিছু অযোগ্য মানুষ দায়ী?





