সূর্যমুখীর স্বপ্নসারথী প্রকৃতিপ্রেমী সুজন

0
0

ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি :

” Nature never did betray the heart that loved her ” ইংরেজ কবি ওয়ার্ডসওয়ার্থ তাঁর “Tintern Abbey” কবিতায় এভাবেই গেয়েছেন প্রকৃতি বন্দনা।
” রোদ মেখো সূর্যমুখী কোনো এক নতুন কাঠামোয় সবুজ হলুদ লালে মিশে তোমার যেনো আবার নতুন মনে হয়। সূর্যকে সাথে নিয়ে তুমি দীপ্তি ছড়াও সূর্যেরই মতো করে হলুদাভ সবুজ আভায়।”

কবি মৃত্যুঞ্জয় দে’র এই সূর্যমুখী প্রীতি জানান দিচ্ছে বসন্তের দিনে প্রকৃতির নতুন রূপসজ্জার

সূর্যমুখী ফুলের অপরূপ সৌন্দর্যে সেজেছে শুদ্ধ সংস্কৃতির পীঠস্থান ব্রাহ্মণবাড়িয়া। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিভিন্ন স্থানে সূর্যমুখী ফুলের বাগান দেখতে প্রতিদিন ভিড় জমাচ্ছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তের অগণিত দর্শণার্থী। মোহ জাগানিয়া এই অপরূপ দৃশ্য ইতোমধ্যেই গোটা বিশ্বের দৃষ্টি কেড়েছে।

গত সোমবার (৮ মার্চ) চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ‘শিনহুয়া’ (Xin Hua) ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সূর্যমুখী ফুল নিয়ে বড় একটি ফটো ফিচার প্রকাশ করেছে।এছাড়াও আন্তর্জাতিক দুবাইভিত্তিক সরকারী সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল টাইমসের এক প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এই সূর্যমুখী উপাখ্যান।

এছাড়া দুবাইয়ের আরো একটি আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা ‘বিগ নিউজ নেটওয়ার্ক’ এবং মাইক্রোসফট কর্পোরেশন’র মালিকানাধীন অনলাইন ওয়েব পোর্টাল ‘এমএসএন’ এর চীনা সংস্করণেও একাধিক ছবিসহ প্রকাশ করা হয়েছে ‘বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় ফোটা সূর্যমুখী ফুল’ শিরোনামের প্রতিবেদনটি

” Bangladesh’s consumption of sunflower oil is rising in recent years with soaring prices of soybean and palm oils, which are used mostly in the country.

Farmers in parts of Bangladesh including the Brahmanbaria district, some 109 km east of the capital Dhaka, are being encouraged to take up more cultivation of sunflowers, one of the most important seed crops grown usually in temperate countries.
(Xin Hua, Global Times,MSN-China Edition- 8 March, 2021)

জানা গেছে, মুজিববর্ষকে সামনে রেখে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এবারই প্রথম সূর্যমুখী ফুল চাষে আগ্রহী হয়েছেন কৃষকরা। পৌর এলাকার ভাদুঘর, নাসিরনগর উপজেলার পূর্বভাগ গ্রাম সহ জেলার প্রায় প্রতিটি উপজেলায় এই সূর্যমুখী বাগান নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ দেখা গেছে। স্থানীয় কৃষি অফিসের তথ্যানুযায়ী, নবীনগর উপজেলার বিটঘর ইউনিয়নের মহেশপুর গ্রামের খন্দকার শওকত আলীর বিদেশ ফেরত মেরিন ইঞ্জিনিয়ার ছেলে খন্দকার মঈন উদ্দিন বুড়ি নদী (তিতাসের শাখা নদী) সংলগ্ন পৈত্রিক প্রায় ৮০ বিঘা জমিতে সূর্যমুখী ফুলের চাষ করেছেন। তাঁর এই সুবিশাল সূর্যমুখী প্রকল্পের নাম ‘মনা’।

প্রকল্প পরিচালক প্রকৃতিপ্রেমী মঈনউদ্দিন সুজনের সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানান,
” আমি পেশায় একজন মেরিন ইঞ্জিনিয়ার। এই পর্যন্ত প্রায় ১৩০টি দেশ ঘুরেছি। বৈশ্বিক প্যানডেমিকের কারণে দেশে আটকে যাই। ছোটবেলায় বাবার সাথে জমিতে এলেও সেভাবে কখনো কৃষিকাজে সম্পৃক্ত হই নি। প্রকৃতিপ্রেমী হওয়ায় নিতান্তই শখের বশে বন্ধুর উৎসাহে প্রকল্পটি নিয়ে আস্তে আস্তে কাজ শুরু করি। বর্তমানে এতো সাড়া পাচ্ছি যা অভাবনীয়। শুরুতে আমি কোনো সংবাদমাধ্যমকে আমার প্রজেক্ট নিয়ে কিছু জানাইনি। কিভাবে যে আমার এই প্রজেক্ট বিশ্বময় ছড়িয়ে গেলো নিজেও বুঝতে পারি নি। ভবিষ্যতেও এ প্রজেক্টের কাজ চালিয়ে যেতে চাই।”

সূর্যমুখী চাষে সাফল্য পাচ্ছে কৃষক

তিনি আরো জানান, ” বিগত এক সপ্তাহ ধরে ফুলের কুড়িগুলো ঠিকমতো প্রস্ফুটিত হচ্ছে তবে গত দু তিনদিনে আবহাওয়ার তারতম্যের কারণে ফুলগুলো কিছুটা জৌলুসহীন হয়ে পড়ছে।”

প্রজেক্টে ঘুরতে আসা কয়েকজন দর্শনার্থী জানান,
“এই গ্রামে প্রথমবারের মতো এমন একটি বিশাল প্রকল্প হওয়ায় আমরা উচ্ছসিত। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের সুযোগ তৈরি হওয়ায় আমরা এ নিয়ে আশাবাদীও বটে। ”

সৌন্দর্য্যের পাশাপাশি এ ফুলের রয়েছে অনেক পুষ্টিগুণ। পুষ্টিবিদদের মতে, বিশ্বের সর্বোৎকৃষ্ট মানের ভোজ্যতেল তৈরি হয় এই সূর্যমুখী থেকে যা নিয়মিত সয়াবিন কিংবা পাম তেলের তুলনায় অধিক স্বাস্থ্যসম্মত এবং পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ। এছাড়াও সূর্যমুখীর বীজে রয়েছে উন্নতমানের ভিটামিন ই যা অ্যান্টি-অক্সিডেন্টের কাজ করে। নিয়মিত এটি খেলে অষ্টিওআর্থ্রাইটিস (হাড় ক্ষয়) হওয়ার ঝুঁকি কমে যায়। সূর্যমুখী বীজ আমাদের শরীরের হাড়ের সুস্থতা ও মজবুত ভাব বজায় রাখে। শরীরের ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম ও কপারের চাহিদা পূরণ করে সূর্যমুখী তেল। সূর্যমুখী তেলে বিদ্যমান ম্যাগনেসিয়াম আমাদের মানসিক চাপ দূর করতে সহায়তা করে। ভিটামিন ই’র আধিক্য থাকায় সূর্যমুখী তেল দ্রুত চুল বড় হতে সাহায্য করে। এছাড়াও মাইগ্রেনের সমস্যা এবং মাথা ঠাণ্ডা রাখতে সাহায্য করে এই তেল। সূর্যমুখী বীজের তেলে বিদ্যমান ভিটামিন ই আমাদের ত্বককে রক্ষা করে সূর্যের আল্ট্রা ভায়োলেট রশ্মি থেকে। এছাড়া এটি হাঁপানি এবং বুক জ্বালাপোড়ায়ও ভীষণ কার্যকরী।