শ্রীলঙ্কা সিরিজের আগেই সেরে উঠবেন মাশরাফি

0
54

Mashrafeসমায়েরপাতাঃ জীবন তাঁকে নির্মমভাবে সহ্য করার শক্তি জুগিয়েছে। তাই আগুনের গোলার মতো ছুটে আসা বল ফলো থ্রুতে থামাতে গিয়ে মনে হচ্ছিল ‘ডান হাতের বুড়ো আঙুলটাই বুঝি খুলে পড়ে গেছে।

’ তবু বোলিং মার্কে ফিরে যাচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু পারেননি আর। তবে ড্রেসিংরুমে ছিলেন ম্যাচের বাকিটা সময়, পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান শেষেই ছুটেছেন হাসপাতালে। চোটজর্জর জীবনের শিক্ষা থেকে বুঝেছিলেন হাঁড় ভেঙেছে, এক্স-রেতে সেটি ধরা পড়ায় সঙ্গে সঙ্গে হাতে পাল্টার পড়েছে। তবু রাতে টিম হোটেলের লবিতে হাস্যোজ্জ্বল মাশরাফি বিন মর্তুজা। ছয় থেকে আট সপ্তাহ মাঠ থেকে ছিটকে পড়ার খবরে হৃদয়ে রক্তক্ষরণ না হয়ে পারে না, হচ্ছেও। তবু স্বভাবসুলভ ঠাট্টা করে চলেছেন তিনি, যেন মেনেই নিয়েছেন নিয়তি!

কোরে অ্যান্ডারসন তখন ব্যাটটাকে গদা বানিয়ে তুমুল পেটাচ্ছেন বোলারদের। মাশরাফির চতুর্থ ও শেষ ওভারের দ্বিতীয় বলটাও সোজা ব্যাটে চালিয়েছিলেন তিনি। ফলো থ্রুতে সেটা থামাতে গিয়েই ডান হাতের বুড়ো আঙুলের নরম মাংসল অংশে ব্যথা পান মাশরাফি। ক্রিকেট মাঠে ব্যথা পেয়ে কঁকিয়ে ওঠায় বীরত্ব নেই। বরং সব ব্যথা উপেক্ষায় উড়িয়ে প্রতিপক্ষকে পাল্টা বার্তা দেওয়াই রেওয়াজ। মাশরাফিও ডান হাতটা বারকয়েক ঝাড়া দিয়ে যাচ্ছিলেন বোলিং মার্কে। কিন্তু মিড অন থেকে সাকিব আল হাসান দৌড়ে এসেই জরুরি তলব করেন ফিজিওকে। এরপর ওভারের বাকি চারটি বল আর করা হয়নি মাশরাফির। ম্যাচের পর চিকিৎসককে দেখিয়ে জানতে পারেন, চার থেকে ছয় সপ্তাহ সময় লাগবে সুস্থ হয়ে মাঠে ফিরতে। যদিও মাশরাফির নিজের ধারণা সময়কালটা আট সপ্তাহের মতো হবে। তাতে শ্রীলঙ্কা সফরের আগে মাঠে নামা সম্ভব নয় তাঁর পক্ষে।

অবশ্য মাঠেই বুঝেছিলেন মাশরাফি, ‘বলটা হাতে লাগার পর মনে হচ্ছিল বুড়ো আঙুলটা বুঝি খুলে পড়ে গেছে! তখন ব্যথা বুঝতে পারিনি, পুরোটাই তো অবশ হয়ে গিয়েছিল। সঙ্গে সঙ্গে ফুলে যাওয়াতে বুঝে গিয়েছিলাম আঙুল ভেঙেছে। ’ গতকাল রাতে হোটেল লবিতে বসে নিজের মোবাইলে তোলা এক্স-রের ছবি দেখাচ্ছিলেন মাশরাফি, ‘দুটি হাড়ের জোড়া কেমন হাঁ হয়ে আছে দেখেন। আরেকটু জোরে লাগলে দুই টুকরা হয়ে যেত আঙুল। দুই হাঁটুতে সাতটি অস্ত্রোপচার করানো মাশরাফির সামনে আরেকবার অপারেশনের টেবিলে শোয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেননি তাওরাঙ্গার চিকিৎসক। সেটা অবশ্য নির্ভর করছে আরো উন্নত চিকিৎসা প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী আজ অকল্যান্ডে গেছেন মাশরাফি। ১৯ তারিখ সেখান থেকে সিডনি যাওয়ার কথা। তবে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অকল্যান্ডে এক দিন থেকেই সিডনি যেতে চেয়েছিলেন মাশরাফি, ‘কিন্তু টিকিট পাচ্ছি না। এ অবস্থায় নিউজিল্যান্ড ক্রিকেটের চিকিৎসককে আঙুলটা দেখাতে পারি। এরপর সিডনিতেও দেখাব, শুনেছি সেখানে নাকি আঙুলের হাড় ভাঙার চিকিৎসাটা ভালো হয়। তবে মনে হয় না অপারেশন লাগবে। ডাক্তার বললেও করাব না। আমি তো আর ব্যাটসম্যান না, অপারেশন না করালেও চলবে। ’

তাওরাঙ্গার টিম হোটেল ট্রিনিটি হোয়ার্ফের লবিতে তখন গাদাগাদি ভিড়। রাত ১০টার মধ্যে লাগেজ জমা দিতে হবে কনসার্জে, ক্রিকেটাররা প্লেনে ওয়েলিংটন গেলেও ব্যাগপত্তর দীর্ঘ পথ পাড়ি দেবে বাসে। তো, যে-ই পাশ দিয়ে যাচ্ছেন, সমবেদনার হাত রাখছেন মাশরাফির কাঁধে। ফিজিও ডিন কনওয়ে পরামর্শ দিচ্ছেন, পাশে দাঁড়ানো ট্রেনার মারিও ভিল্লাভারায়েন বুঝিয়ে দিচ্ছেন পুনর্বাসনের সূচি। সে মতে দুই সপ্তাহ পরই জিম শুরু করবেন মাশরাফি। মার্চ-এপ্রিলের শ্রীলঙ্কা সিরিজ শুরু হবে টেস্ট সিরিজ দিয়ে। তাই ওয়ানডের আগে সুস্থ হয়ে উঠতে পর্যাপ্ত সময় পাচ্ছেন মাশরাফি, ‘শ্রীলঙ্কা সিরিজের আগেই সুস্থ হয়ে উঠব ইনশাল্লাহ। সর্বোচ্চ আট সপ্তাহও যদি লাগে, অসুবিধা নেই। ’ বাইরে ডিনার করে হোটেলে ঢোকার মুখে মাশরাফিকে দেখে এগিয়ে আসেন বোলিং কোচ কোর্টনি ওয়ালশ। অধিনায়ককে বুকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্ব্তনা দেন, ‘ব্যাড লাক। ভুল কারণে পাওয়া ছুটিতে পরিবার নিয়ে ঘুরে বেড়াও। ’ সে আর হতে দিচ্ছেন না মিসেস মাশরাফি। স্বামী চোট পাওয়ার পর থেকেই নাকি দেশে ফেরার জন্য আকুল তাঁর স্ত্রী সুমি, জানিয়েছেন মাশরাফিই, ‘ওর মন খুব খারাপ হয়ে গেছে। তাই ঘোরাঘুরি বাদ দিতে বলছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সিডনিতে গিয়ে ডাক্তার দেখিয়েই বাড়ি ফিরতে চায়। ’ টিকিট বদলাতে পারলে সেটিই করতেন মাশরাফি। কিন্তু গতরাত পর্যন্ত চেষ্টা করেও অকল্যান্ডে থেকে সিডনির এয়ার টিকিটের তারিখ বদলাতে পারেননি তিনি।

টেলিফোনে সেটি জানার পরও স্থির মাশরাফি। চারপাশে ভিড় করা সংবাদকর্মীদের আহাজারি, ওই বলটায় হাত না বাড়ালেও তো পারতেন। ‘না, সেটা হয় নাকি। ইন্সটিঙ্কট থেকে হাতটা অটোমেটিক চলে যায়’, স্লিংয়ে ঝোলানো ডান হাত নাড়িয়ে বলছিলেন তিনি। তাতে আঁতকে ওঠেন অনেকে, ‘আরে, ভাঙা হাতটা নাড়াচ্ছেন কেন!’ দেখে মাশরাফি হাসেন, কিছুক্ষণ ডান হাতটা স্থিরও থাকে। কিন্তু এরপর আবার সেই হাত নাড়ানাড়ি। ইন্সটিঙ্কট আর কি!

১৬ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে হাঁটুই সবচেয়ে ভুগিয়েছে মাশরাফিকে। গোড়ালি থেকে শুরু করে কোমর কিংবা পাঁজরের পাশে পেশি কিংবা হ্যামস্ট্রিং, গ্রোয়েনও ভুগিয়েছে তাঁকে। এবারই প্রথম আঙুল ভেঙে মাঠের বাইরে মাশরাফি, ‘হুম, আর কিছু বাকি থাকল না!’ শুনে হাসির একটা রোল ওঠে লবিতে।

সঙ্গে সঙ্গে আবার কয়েক মুহূর্তের থমথমে নীরবতা। ক্রিকেট যাঁর জীবন সংগ্রাম, তাঁর ক্যারিয়ারে বারবার ইনজুরির ছোবল ব্যথিত করে কাছের-দূরের মানুষদের। আরেকটি হার কিংবা ৬-০ ভুলিয়ে দেওয়া সে বেদনা আসলে নীরব প্রার্থনা—দ্রুত সেরে উঠুন মাশরাফি।