অপরাধ প্রবণতা – সন্ত্রাস, মাদকাসক্তি, দুর্নীতি ও কিশোর অপরাধ

0
13

আবি আব্দুল্লাহ,  (শিক্ষার্থী স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়):

বয়সের দিক থেকে সাধারণ ৭ থেকে ১৬ বছর বয়সী কিশোর কিশোরী দ্বারা সংঘটিত অপরাধই কিশোর অপরাধ। তবে বিভিন্ন দেশে বয়সের তারতম্য রয়েছে। কোনো কোনো দেশে ১৩ থেকে ২২ বছর আবার কোনো দেশে ১৬ থেকে ২১ বছর বয়সী কেউ অপরাধ করলে কিশোর অপরাধী হিসেবে বিবেচিত হয়।

গতকয়েক বছর ধরে একটি নতুন সমস্যা আমাদের সমাজকে কে হুমকির মুখে ফেলে দিচ্ছে। এই সমস্যাটি দিন দিন মারাত্মকভাবে বেড়েই চলছে। আর এই ক্রমবর্ধমান সমস্যা টি হলো কিশোর অপরাধ। ‘কিশোর অপরাধ ’ কিংবা ‘কিশোর-গ্যাং’ , এটাকে যাই বলি না কেন, আমাদের তরুনরা এর প্রভাবে দিন দিন বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে যাচ্ছে। তারা প্রায় সময়ই দলবদ্ধ হয়ে এমন কিছু করে বসে যা আমাদের কে তাদের ভবিষ্যত সম্পর্কে দুশ্চিন্তিত করে তোলে। ১৯৮০ সাল থেকে ক্রমশ বেড়ে চলা এই কিশোর অপরাধ নামক ব্যাধিটি সাধারণ মানুষের মনে ভয়ের অন্যতম একটা কারন হয়ে দাড়িয়েছে এবং কিশোর অপরাধের ব্যাপারে তারা যা ভুল ভাবতো, তা দিন দিন স্পষ্টতর হচ্ছে। কিশোর অপরাধ কিংবা সংঘবদ্ধ আগ্রাসনের প্রভাবে কিশোর-তরুনরা অনেক ক্ষতির সম্মুখিন হচ্ছে । যেমন , সহিংসতা, মাদক দ্রব্যের পাচার , মুল্যবোধের অবক্ষয় সহ আরও নানান ধরণের কিশোর অপরাধ। সাধারণত কিশোর বলতে ১৩ থেকে ১৮ বছরের বয়সীদের কে বুঝানো হয়। প্রকৃতপক্ষে, আমাদের সমাজে এই কিশোরদেরই সবচেয়ে বেশি অবিহেলিত এবং অবজ্ঞা করা হয়। তাছাড়া, প্রতিটা মানুষই ১৩ হতে ১৮ বছর বয়সের সময় অনেক দ্রুতই শারীরিক এবং মানসিক পরিবর্তনের এক বিশাল ধাক্কার মধ্য দিয়ে যায়, যা কিনা সে মানুষ নিজেই বুঝতে পারেনা। এই সময়েই যেহেতু একজন মানুষের সার্বিক পরিবর্তন হয়ে থাকে, সেহেতু তাদের শারিরীক অসুস্থতা, হতাশা কিংবা আগ্রাসী মনোভাবের ফলে হুমকির অনেক সম্ভাবনা থাকে বলে এই সময়টা জীবনের সবচেয়ে বেশি ঝুকিপূর্ণ সময়। বিশেষত, এসময়ে যখন হঠাৎ অনেক পরিবর্তন আসতে শুরু করে, কিশোর-কিশোরীরা তাদের বাবা-মায়ের থেকে আলাদা আলাদা থাকতে চায়, কিছুটা লাজুক হয়ে যায় এবং এ সময় তাদের সহপাঠি কিংবা বন্ধু-বান্ধবরাই তাদের কাছে বিশ্বস্ত মানুষ হয়ে ওঠে।

বর্তমানে এই কিশোর অপরাধ বাংলাদেশে নতুন হুমকি এবং উদ্বেগের কারণ হয়ে দাড়িয়েছে। সম্প্রতি কয়েক বছরে দেশের বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলে কিশোরদের কর্তৃক দখলদারিত্ব, মাদক সেবন, যৌন হয়রানি এমনকি হত্যার অভিযোগ ও উঠেছে। এরা একটা বিশেষ চক্রের মতো কাজ করে । আর তাই সাধারন মানুষ মনে করে যে, তারা কোনো না কোনো রাজনৈতিক ব্যাক্তিত্ব কিংবা প্রভাবশালি নেতা কর্তৃক পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে থাকে। তাই তাদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষও কিছু বলতে ভয় পায়।
কিন্তু একটা কিশোর এমন অপরাধপ্রবণ কাজকর্মের সাথে জড়িত হয়ে যাবার কারণ কি হতে পারে? এর অনেক গুলো কারণের মধ্যে একটা কারণ সবাই বিশেষভাবে উল্লেখ করেছে যে, এই সময়ে তাদের হার না মানা কিংবা ছোট না হওয়ার মনোভাব এবং পারিপার্শিক সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারনেই একজন কিশোর অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়ে।

  • কিশোর অপরাধের সংজ্ঞা:
    সমাজে বিদ্যমান মূল্যবোধ ও নিয়মনীতি বিরোধী কাজই যখন কিশোরদের দ্বারা সংঘটিত হয় ,তখন তাকে কিশোর অপরাধ বলে। মূলত বয়সের দিক থেকে সাধারণত ৭ থেকে ১৬ বছর বয়সী কিশোর কিশোরী দ্বারা সংঘটিত অপরাধই কিশোর অপরাধ ।সামাজিক মূল্যবোধ রাষ্ট্র, শহর, গ্রাম বা এলাকাভেদে বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে। কোনো এক সমাজে যে কাজ মূল্যবোধ ও নীতি বিরোধী অন্য সমাজে তা গ্রহনযোগ্য হতে পারে আন্তর্জাতিক অপরাধ বিজ্ঞানী বিসলার বলেছেন- কিশোর অপরাধ হলো প্রচলিত সামাজিক নিয়মকানুনের উপর অপ্রাপ্ত বয়স্ক কিশোরদের অবৈধ হস্তক্ষেপ। অপরাধ বিজ্ঞানী বার্টের ভাষায়- কোনো শিশুকে তখনই অপরাধী মনে করতে হবে যখন তার অসামাজিক কাজ বা অপরাধ প্রবণতার জন্য আইনগত ব্যবস্থার প্রয়োজন পড়ে।মূলত অস্বাভাবিক ও সমাজে গ্রহনযোগ্য হয়না এমন কাজ যা কিশোর-কিশোরীরা সংঘটিত করে,তাকে কিশোর অপরাধ বলে।
    যেমন, সম্প্রতি ব্যাপকভাবে আলোচিত একটি কিশোর গ্যাংয়ের একটি ঘটনা হলো TikTok ভিডিও প্রস্তুতকারক ‘অপু ভাই’ এর ঘটনা। ইয়াসিন আরাফাত অপু ওরফে অপু ভাই উত্তরা সেক্টর-৬ রাস্তার মধ্যে তার দলবল নিয়ে টিকটক ভিডিও বানাচ্ছিলো। তখন পথচারীদের রাস্তা পারাপারে সমস্যা হচ্ছিল। একজন পথচারী রাস্তায় জায়গা দিতে বললে তার গ্যাংয়ের সদস্যরা আক্রমণ করে ঐ পথচারীকে জখম করে দেয়। পরে পুলিশ এ ঘটনায় টিকটকাার অপুকে গ্রেফতার করে।
    (প্রথম আলো,২০২০)সাম্প্রতিক সময়ে আরো একটি আলোচিত গ্যাংয়ের নাম ‘স্টার বন্ড’। এর সদস্য সংখ্যা ছিলো ১৭ জন। ইয়াবা এবং দেশীয় অস্ত্র সহকারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ২০১৯ গ্রেফতার হয় ‘স্টার বন্ড’ নামক এই গ্যাংটি।
    (প্রথম আলো,২০১৯)

    দেশে প্রতিনিয়ত অস্বাভাবিক মাত্রায় কিশোর অপরাধ বৃদ্ধি পাচ্ছে । হাজার হাজার কিশোর গ্যাং ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বাংলাদেশের আনাচে কানাচে। প্রতিটি গ্যাংয়ের থাকে একটি অনন্য নাম। যেমন: ডিস্কো বয়েজ, ইগল, রেক্স। কখনো দলের নাম হয় দলনেতার নামে। যেমন: জিশান গ্রুপ,শামিম গ্রুপ ইত্যাদি। মূলত সমাজের ভাঙন প্রবনতা এবং ক্ষমতার কেন্দ্রে যাওয়ার আকাঙ্খা থেকেই শুরু হয় কিশোরদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের যাত্রা। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কিশোর অপরাধ বৃদ্ধির পিছনে রাজনৈতিক একটি দলের অদৃশ্য হাত থাকে। এছাড়া প্রয়োজনীয় শিক্ষার অভাব ও অপসংস্কৃতি এটি বৃদ্ধির পিছনে অনেক ভাবে দায়ী। ইন্টারনেটের সীমাহীন ব্যবহার ,মোবাইল ফোন, অশ্লীল ভিডিও আসক্তি ,পারিবারিক ও সমাজিক অবক্ষয় ,সামাজিক মূল্যবোধের অভাব, পিতামাতা অবৈধ উপার্জন ইত্যাদি কিশোর গ্যাং ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারন। কিশোর অপরাধ বৃদ্ধি হচ্ছে যে সব কারণে এর মধ্যে অন্যতম কিছু কারণ নিন্মে আলোচনা করা হলো।

  • বয়ঃসন্ধিকাল:
    প্রতিটি মানুষের জন্য বয়ঃসন্ধিকাল একটি প্রাকৃতিক বিষয়। বয়ঃসন্ধিকালের মাধ্যমে একজন শিশু প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে উঠে এবং তার মধ্যে প্রজনন ক্ষমতা তৈরী হয়। বয়ঃসন্ধিতে কিশোর কিশোরীদের মাঝে উল্লেখযোগ্য কিছু পরিবর্তন চোখে পড়ে। এরমধ্যে অন্যতম হলো শারীরিক পরিবর্তন ,মানসিক পরিবর্তন এবং আচরণগত পরিবর্তন। বয়ঃসন্ধিকালে কিশোর কিশোরীদের আকস্মিক ভাবেই পরিবর্তন আসে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে তারা প্রায়শই মানসিক চাপের মধ্যে পড়ে। তখন তারা নিজেদের কে অসহায় এবং ক্ষমতাহীন মনে করে। আর তখনই সম্মানিত হওয়ার মিথ্যা চিন্তা নিয়ে কোনো দলের সাথে জড়িয়ে পড়ে অথবা নিজেই একটা দল তৈরি করে। এর মধ্যে দিয়েই অপরাধের উন্মুক্তদ্বারে প্রবেশ করে কিশোর কিশোরীরা।
  • মানসিক এবং শারীরিক সমস্যা:
    শারীরিক এবং মানসিক সমস্যা কিশোর কিশোরীদের অপরাধের দিকে ক্রমশ টেনে নিয়ে যায়। কিশোর কিশোরীদের চিন্তাভাবনায় ক্রমান্বয়ে অবনতি ঘটে। তাদের আশেপাশের সবাইকে শত্রু ভাবতে শুরু করে। ভালো পরামর্শ তাদের কাছে অসহ্য লাগে। তারা নিজেরদেরকে জড় বস্তুর মত মনে করে। এই ধরনের মানসিক অবসাদ থেকে মুক্তি পেতে হাতের কাছেই পাওয়া এমন সহজলভ্য কিছু মাদক দ্রব্য গ্রহন করা শুরু করে। যার কারণে নতুন একটি চক্রের সাথে সম্পৃক্ততা শুরু হয় এবং আস্তে আস্তে কিশোর অপরাধে জড়িতে পড়ে। মানসিক বিকারগস্ত কিশোর কিশোরীদের অপরাধ প্রবনতা অনেক বেশি থাকে। যার কারণে কিশোর কিশোরীদের অপরাধে জড়িয়ে সম্ভবনা সবচেয়ে বেশি।
  • গ্যাং সম্পৃক্ততা, সংস্কৃতি ও জীবনধারা:
    বর্তমান সময়ে ওয়েস্টার্ন কালচারের প্রতি কিশোর কিশোরীদের আগ্রহ ব্যাপকভাবে পরিলক্ষিত। পশ্চিমা সভ্যতাকে অনুসরণ করতে গিয়ে তাদের সংস্কৃতি এবং জীবনযাত্রাকে অনুকরণ করে ধীরেধীরে নিজ দেশের লালিত ঐতিহ্য এবং মূল্যবোধ পরিবর্তিত করে ফেলে কিশোর কিশোরীরা। মাদক দ্রব্য গ্রহন করা, অন্যের উপর নিজের আধিপত্য দেখানো এমনকি মতের অমিল হলে হত্যা করাও এদের কাছে খুব সহজলভ্য ব্যাপার। কিশোর অপরাধ দমনের প্রধান এবং প্রথম হাতিয়ার হল পরিবার। যখনই কোনো গ্যাংয়ের সাথে সম্পর্ক তৈরী হয় কিশোর কিশোরীদের, তখন এধরণের অপরাধ তাদের দ্বারা সংঘটিত হয়। মূলত পরিবারের সাথে সম্পর্কের অবনতি ঘটলে কিশোরদের অপরাধ প্রবনতা বৃদ্ধি পায়।
  • জনপ্রিয়তা, মর্যাদা বা সম্মান:
    জনপ্রিয়তা এবং সম্মান বৃদ্ধির নেশা কিশোর অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারন। কিশোর অপরাধে জড়িয়ে পড়লে কিছু আকর্ষণীয় সুযোগ পাওয়া যায় । যেমন: নেশা জাতীয় পণ্য বিক্রি করে প্রচুর অর্থ উপার্জন করা। এছাড়াও কিশোর কিশোরীরা মনে করে কোনো গ্যাংয়ের সদস্য হতে পারলে ব্যক্তিগত অনেক সুবিধা পাওয়া যায়। সামাজিক,অর্থনৈতিক , সাংস্কৃতিক সুবিধা এবং অন্য গ্যাং থেকে সুরক্ষা জন্য অনেক কিশোরকে তাদের নিজের অজান্তেই কিশোর অপরাধের দিকে ঠেলে দেয়।
  • মানসিক এবং বয়ঃসন্ধির প্রভাব:
    স্বাভাবিক ভাবেই ১৩-১৪ বছর বয়সের মধ্যেই একটি শিশুর বয়ঃসন্ধিকাল ঘটে। এ সময়ে যদি সে কোনো অভিভাবক না পায় তাহলে তার জন্য অনেক সিদ্ধান্ত নেয়া কঠিন হয়ে পরে। এই আবেগ এবং শারীরিক পরিবর্তনের সময়ে চাইলেই তাদেরকে ভালো কোনো কাজের সাথে সম্পৃক্ত করে দেয়া যায়। একজন অভিভাবক বা বন্ধু তখন ঐ কিশোরের পাশে দাড়ানো অতীব জরুরি। অন্যথায় ঐ কিশোর জড়িয়ে পড়তে পারে অপরাধ প্রবন কোনো কাজের সাথে ।
  • বিনোদন মূলক কার্যক্রমের অভাব:
    ‘কিশোর অপরাধ’ বর্তমান সমাজের জন্য একটি গুরুতর উদ্বেগের কারণ। শিক্ষাবিদ এবং মানবাধিকার কর্মীরা সুষ্ঠূ বিনোদন নিশ্চিত করার জন্য রাষ্ট্রকে প্রতিনিয়ত সচেতন করছে ।
    সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, পরিবারের বেখেয়ালিপনা, ইন্টারনেটের অবাধ ব্যবহার এবং স্মার্ট ফোনের অপব্যবহার, পর্ণ আসক্তি, নৈতিক শিক্ষার অভাব এবং অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতি কিশোর অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।
  • সহযোগিতা এবং সুরক্ষার অভাব:
    রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে নির্যাতিত অথবা সামাজিক ভাবে অবহেলিত কিংবা পরিবার থেকেও কোনো ধরনের সুরক্ষা না পাওয়া কোনো কিশোর সহজেই অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। কিশোর অপরাধে জড়িত অথবা কিশোর গ্যাংয়ের সাথে সম্পৃক্ত সদস্যরা যৌবনে তাদের স্বাভাবিক জীবন যাপন থেকে বঞ্চিত হয়। একজন কিশোর অপরাধী বা সক্রিয় গ্যাং সদস্য হিসেবে গ্যাংয়ের কার্যকলাপ এবং অন্য কোনো সদস্যদের প্রয়োজনে পাশে দাড়ানোর অনূভুতি স্বর্গীয় প্রশান্তি বয়ে আনে ঐ সদস্যের মনে। তারা নিজেদেরকে নিরাপদ ভাবা শুরু করে এবং মানসিক প্রশান্তি পায়। পরিবার থেকে সমর্থন এবং নিরাপত্তা পায়নি এমন শিশুই পরবর্তীতে অধিকহারে কিশোর অপরাধের সাথে সংশ্লিষ্ট হওয়ার প্রমাণ মিলে।

 

  • সুশিক্ষার অভাব:

বর্তমান সমাজে সুশিক্ষার অভাব ব্যাপক ভাবে পরিলক্ষিত। পুথিগত বিদ্যা থাকলেও নেই কোনো নৈতিক শিক্ষা। যার কারণে অপরাধ প্রবনতা মনের মধ্যে প্রবঞ্চনা দিতে থাকে। একসময়ে নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি আগ্রহ শুরু হয় কিশোর কিশোরীদের মনে। যার প্রাথমিক ধাপ শুরু হয় ছোটোখাটো চুরি,ছিনতাই ও ইভটিজিং এর মধ্যে দিয়ে। এভাবেই একজন কিশোর/ কিশোরী জড়িয়ে পড়ে মারাত্মক সব অপরাধের সাথে।

  • পিতামাতার বেখেয়ালিপনা:
    বর্তমানে বেশিরভাগ অভিভাবকই পরিবার পরিচালনার পাশাপাশি কোনো না কোনো ভাবে বিভিন্ন পেশায় নিযুক্ত রয়েছে। যে কারণে অভিভাবকগণ পর্যাপ্ত সময় পায়না তাদের সন্তাদের যত্ন নেয়ার অথবা তাদের সাথে সময় কাটানোর। শেষ পর্যন্ত ঐ সব কিশোর কিশোরীদের নৈতিক মূল্যবোধ শেখা আর হয়ে ওঠেনা। জীবনের কঠিন সময় পার করার সময় সঙ্গী খোঁজে কিশোর-কিশোরীরা। শেষ পর্যন্ত সঙ্গী খুঁজে পায় কিশোর অপরাধ করার মধ্যে দিয়ে।

দারিদ্র্যতা:
কিশোর অপরাধের অন্যতম কারন হিসেবে দারিদ্র্যতা মূখ্য ভূমিকা পালন করে, তা বলাই বাহুল্য। দারিদ্র্যতার কষাঘাতে জর্জরিত পরিবার গুলো থেকে উঠে আসা বাড়ন্ত কিশোর কিশোরীদের নিত্যদিনের মৌলিক চাহিদাগুলো কখনোই পূরণ হয় না। মেধা বিকাশের সময়টাতে দরিদ্র্য পরিবারের কিশোর কিশোরীরা জীবিকা নির্বাহর তাগিদে ছোটে পথে-প্রান্তরে। কিন্তু মহাজন কিংবা মালিকের হয়ে অনেক কষ্টের কাজ করেও অভাবের দুষ্টচক্র থেকে তারা বের হতে পারে না। ফলস্বরূপ নিজেদের মধ্যে তৈরি হয় ক্ষোভ। আর এ ক্ষোভ থেকেই কিশোর অপরাধমূলক আচরণ সৃষ্টি হতে পারে। এ কারণে এরা ছোটখাটো চুরি বা ছিনতাইয়ে অংশগ্রহণ করে এবং তা ক্রমশই বড় অপরাধের দিকে ধাবিত হয়। দারিদ্র্যের কারণে আত্মহত্যা বা ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় পতিতাবৃত্তি গ্রহণ করতেও বাধ্য হয় অনেক কিশোর-কিশোরী।

  • আইন ও প্রতিকার

১৯৫০ সালে জাতিসংঘের দ্বিতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে কিশোর অপরাধের বিষয়ে বলা হয়– কিশোর অপরাধের সংজ্ঞার ওপর অতিশয় গুরুত্ব দেয়ার প্রয়োজন নেই। তবে অপ্রাপ্তবয়স্কদের দ্বারা সংঘটিত সব ধরনের অপরাধ আইন ভঙ্গমূলক এবং খাপছাড়া বা অসংগতিপূর্ণ এমন আচরণ যা সমাজস্বীকৃত নয়– এসবই কিশোর অপরাধ।

বাংলাদেশে দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ধারা ৮২ অনুযায়ী ৯ বছরের কম বয়স্ক কোনো ব্যক্তির অপরাধমূলক কাজকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয় না। ধারা ৮৩ অনুযায়ী ১২ বছর বয়স্ক কোনো কিশোরও যদি তার কাজের প্রকৃতি ও ফলাফল বুঝতে সক্ষম না হয় তাহলে তাকেও অপরাধী বলে গণ্য করা হবে না। শিশু আইন ২০১৩-এর ৪ ধারা বিদ্যমান ‘অন্য কোনো আইনে ভিন্নতর যাহা কিছুই থাকুক না কেন, অনূর্ধ্ব ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত সব ব্যক্তি শিশু হিসেবে গণ্য হইবে।’ অর্থাৎ, দণ্ডবিধি ও শিশু আইন পর্যালোচনা করে বলা যায় ৯ বছর (ক্ষেত্রবিশেষে ১২ বছর) থেকে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে কেউ অপরাধ করলে শিশু বা কিশোর অপরাধী হিসেবে বিবেচিত হবে।

 

  • মন্তব্য:
    সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকটি অপরাধ ও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে যা বেশিরভাগ কিশোরদের দ্বারা সংঘটিত হয়েছে। সমাজের নতুন একটি বিষফোঁড়ার নাম কিশোর গ্যাং কালচার। কিশোর গ্যাংয়ের বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বীভৎস দৃশ্য দেখে স্তম্ভিত পুরো দেশ। সময় এসেছে এই দুশ্চিন্তার অবসান ঘটানোর। কেননা সামাজিক মূল্যবোধকে বারবার বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে গ্যাং কালচার। ভিক্ষাবৃত্তি থেকে শুরু সমাজে নানা ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি , দলবদ্ধহয়ে মারামারি করা, মাদক দ্রব্য সেবন এবং মাদককে সহজলভ্য করে তোলার পিছনে গ্যাং কালচার ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কিশোর অপরাধীদের তৎপরতা কমানোর জন্য আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অপরাধীদের গ্রেফতার করে কারাগারে বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠায়। কিন্তু এটাই কি একমাত্র সমাধান? আমরা জানি, কিশোর বা কিশোরীরা আবেগ দ্বারা প্রভাবিত এবং পরিচালিত। অতএব, কিশোর অপরাধে বিরুদ্ধে সর্বোত্তম লড়াই হলো তাদের নিবিড় পর্যবেক্ষণ করা এবং তাদের কে সময় দেয়া। সামাজিক মূল্যবোধ ও পারিবারিক শিক্ষায় দীক্ষিত করা । সুষ্ঠু বিনোদনের ব্যবস্থা করে দেয়া। তবেই কিশোর অপরাধ থেকে আমাদের জাতি মুক্তি পাবে।