

মোঃ মিজু আহমেদ, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমে বিভাগ স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ:
‘পথ থেকে পথে’ বইটির ইতি কথাঃ
মোনাজাত উদ্দিনের গল্প কথা নিয়ে লেখা ‘পথ থেকে পথে’ বইটি প্রকাশিত হয় পৌষ ১৩৯৭, জানুয়ারী ১৯৯১ সালে। বইটির প্রকাশক মঞ্জুর সরকার । তিনি লিখেছেন, অগ্রজপ্রতিম সাংবাদিক মোনাজাত উদ্দিন আমার প্রিয়তম। আমি তাঁর কিছু লেখা বই আকারে বের করতে পেরে আনন্দিত, এবং গর্বিত।
বইটির মুখবন্ধ লেখেন বজলুর রহমান। যিনি দৈনিক বাংলা সংবাদ-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক এবং আই.ও.জে বাংলাদেশ গ্রুপের সভাপতি ছিলেন ।
‘পথ থেকে পথে’ বইটির শুরুতেই আমরা দেখতে পাই একজন সৃষ্ট সাংবাদিক হওয়ার গল্প। অন্যের ফাই, ফরমাস খেটে হলেও নিজের একটি কর্মক্ষেত্র তৈরির অদম্য চেষ্টা । মনে তৃব্য ক্ষোপ হলেও বিনয়ি হয়ে ও সবার সাথে সর্ম্পক ভালো করে চলা। নিজের অসমান্য চেষ্টা ও প্রতিভাকে কাজে লাগি নিজের জায়গা তৈরী করে নেওয়া। “একটা চাকুরি” গল্পে মোনাজাত উদ্দিন তা ব্যক্ত করেছেন। যা আমাদের ব্যক্তি জীবনে অনেক বড় অনুপেরনা তৈরি করে বলা যায়।

একই ভাবে ভণিতা ও কৌশল ব্যবহার করে ‘হাতিরদিয়া বাজার সমবায় সমিতি’- র জেলখানার সত্যতা উদ্ঘাটন করেছিলেন তিনি। একজন সাংবাদিক কতটা বিচক্ষণতার সাথে কাজ করে তা আমরা মোনাজাত উদ্দিনের গল্পের মাধ্যমে উপলব্ধি করতে পারি। যেকোন উৎসবের আমেজ, পরিবার পরিজনের সাথে ভাগাভাগি করে নেওয়াটা একজন সাংবাদিকের হয়ে যায় কষ্টকর । সমাজ ও দেশের কথা ভেবে দায়িত্বের বোঝা দিন দিন বেড়েই চলে, সময় হয়ে ওঠে না ভালোবাসার মানুষগুলোর জন্য। যেমনটা দেখা যায়, “গন্তব্য উল্লাপাড়া” গল্পে, যেখানে ঘূর্ণিঝড়ে মারা গেছে অনেক মানুষ, তছনছ হয়েছে গ্রাম কে গ্রাম। ঝড়ের পরে ত্রাণ বিতরণের কাজ কর্ম কেমন হচ্ছে না হচ্ছে। তাই দেখতে যাচ্ছেন তিনি। কবে ঘরে ফেরা হবে তা জানা নাই। সব কিছু যেনো অনিশ্চিত। পাঁচ দিন পর ঈদ, ঈদের বাজার করা বাকি। কিছু না ভেবে সব ভাগ্যের উপর চাপিয়ে দিয়ে ছুটে চললেন ‘উল্লাপাড়া’-র উদ্দেশ্যে।

মোনাজাত উদ্দিন শুধু গ্রামের মানুষদের নিয়ে কাজ করেনি। তাঁর কলমের কালিতে তুলে ধরছেন জীবিকার তাগিদে গ্রাম থেকে শহরে পারি জমানো মানুষদের কথা। যাদের বাসস্থান অনিশ্চিত । হার ভাঙ্গা শীতের সঙ্গে অনেকে লড়াই করছেন পাতলা একটি শাড়ি গায়ে মুড়িয়ে। কেউ বা খড়ের গদি বানিয়ে শুয়ে আছে চট গায়ে চাপিয়ে। যাদের অধিকাংশই পেটা চালানোর জন্য বেচে নিয়েছেন ভিক্ষাবৃত্তি । অনেকে স্বল্প পয়সায় কাজ করছেন হোটেলে, যুবতী মেয়েরা সস্তায় দেহ বেচে। ”হা উন্নয়ন” গল্পে রাজশাহীর এসব চিত্র ব্যক্তি জীবনে নাড়া দিয়ে ওঠে। শুধু তাই নয়, ভয়কে জয় করে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হয় একজন সাংবাদিককে। উঁচু মহলের চাপ উপেক্ষা করে লক্ষ্য রাখতে হয় দৃঢ়। যেমনটার দেখা মেলে এই “হা উন্নয়ন” নামক গল্পেই, “মলয় ভৌমিক” নামক চরিত্রে যেখানে তার মৃত্যুদন্ড ঘোষণা করা হলেও সে নির্ভয়ে নিজ জেলাতেই অবস্থান করেন।
সাংবাদিকদের কর্মজীবনে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের সাথে পরিচয় হয়। বলতে গেলে সরকারী টাকায় ভুঁড়ি ভোজকারী দালাল থেকে শুরু করে মেধাবী, হতদরিদ্র কিংবা জনকল্যাণমুখী কাজে নিয়জিত ব্যক্তিবর্গ । ঠিক যেমনটি দেখা যায় ”পথ থেকে পথে” বইটিতে চতুর আলীর মতো লোক যে “বিশেষ উড়োজাহাজ” বানানোর নামে সরকারি টাকায় ভুঁড়ি ভোজ করেছেন। আবার অপর দিকে রহমান মিয়া যিনি মেধা খাটিয়ে সিমেন্টের টিউবওয়েল তৈরী করেন, যেটির দাম কম হওয়ায় স্বাচ্ছন্দ্যে মানুষ ক্রয় করতে পারে।সাংবাদিকদের কাছে থাকে রাজনৈতিক অনেক তথ্য। বিভিন্ন কৌশলে এসব গোপন তথ্য আদায় করতে হয়। যেমনটি মোনাজাত উদ্দিন করেছিলেন, “গোলাম আজম “- এর বাংলাদেশে এসে লুকিয়ে সভা-সমাবেশে বক্তৃিতা করার সময়। এই ঘটনাটিতে দেখা গিয়েছিল সাংবাদিক মোনাজাত উদ্দিনের দারুন বিচক্ষণতা।

‘পথ থেকে পথে হেঁটে সত্যকে উদ্ঘাটন করা এবং সাধারণ মানুষসহ সমাজ ও দেশের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরাতেই একজন সাংবাদিকের জীবন নিহিত ।
“পথ থেকে পথে” বইটি আমাদের ব্যক্তি জীবনকে নানা ভাবে অনুপ্রাণিত করে। বইটি পড়ে একজন সাংবাদিক হয়ে ওঠার গল্প যেমন জানতে পারি, তেমনি জানতে পারি দেশ প্রেমের এক বিরল ঘটনা যা মন ছুড়ে যাওয়ার মতো। যেখানে মোনাজাত উদ্দিন নিজের কথা, নিজের পরিবারের কথা না ভেবে কাজ করে চলছেন দেশ দেশ ও দেশের মানুষের জন্য। সমাজের সুবিধা বঞ্চিত মানুষ থেকে শুরু করে শহরের গদি গরম করে বসে থাকা বাবুদের কথা তুলে ধরেছেন তার কলমের কালিতে পরিচয় দিয়েছেন একজন সাহসী ও নির্ভীক সংবাদ কর্মীর।
আজকের এই উন্নত উত্তরবঙ্গের পূর্বে কি বেহাল অবস্থা ছিলো, কতোটা অসহায়ে মানুষ দিন কাটাতো তা জানতেটি পারি “পথ থেকে পথে” বইটির মধমে ।





