আন্তর্জাতিক ডেস্ক: লেবাননে প্রায় তিন বছর ধরে চলা ইসরায়েলি হামলায় প্রায় ৮০০ শিশু নিহত হয়েছে এবং আনুমানিক ৩ লাখ ৬০ হাজার শিশু বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এই সহিংসতার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন লেবাননের কর্মকর্তা ও শিশু অধিকার রক্ষাকারী সংগঠনগুলো।

গত ২৪ ঘণ্টাতেও ইসরায়েলি হামলায় শিশুদের প্রাণহানি অব্যাহত ছিল। দক্ষিণ নাবাতিয়াহ জেলার কাফর রুমান শহরের একটি বাড়িতে বিমান হামলায় দুই শিশু নিহত এবং আরও চারজন আহত হয়। এছাড়া আরবসালিম শহর এবং নাবাতিয়াহ নগরীকে লক্ষ্য করে চালানো ইসরায়েলি হামলায় আরও তিন শিশু আহত হয়েছে।

গত ২৬ জুনে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় স্বাক্ষরিত একটি ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তি সত্ত্বেও এই হামলা চালানো হয়। চুক্তিতে লেবাননি সেনাবাহিনী মোতায়েনের বিনিময়ে লেবাননের ভূখণ্ড থেকে ধীরে ধীরে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের বিধান ছিল।

লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন রবিবার বলেছেন, এই আক্রমণগুলো একটি বিপজ্জনক উস্কানি, যা সংঘাত বন্ধের সমঝোতা এবং ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তির পুনরাবৃত্তিমূলক লঙ্ঘনকেও ছাড়িয়ে গেছে। আউন চলমান সংঘাত বৃদ্ধির জন্য ইসরায়েলকে পূর্ণ দায়ী করেন এবং এই লঙ্ঘন বন্ধ করতে ও দায়ীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।

লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ বিস্তারিত পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, গত ২ মার্চ থেকে ইসরায়েলি হামলায় নিহত ৪ হাজার ৩৬২ জনের মধ্যে ২৫৯ জন শিশু রয়েছে। এছাড়া একই সময়ে আহত ১২ হাজার ৩৭৮ জনের মধ্যে ১ হাজার ৫০ জন শিশু।

লেবাননের পার্লামেন্টের নারী ও শিশু বিষয়ক কমিটির প্রধান এবং এমপি ইনায়া এজাদিন শনিবার জানিয়েছেন, ২০২৪ এবং ২০২০ সালের দুটি ইসরায়েলি যুদ্ধের সময় প্রায় ৮০০ শিশু নিহত হয়েছে।

খাদ্য ব্যবস্থা রূপান্তরের জন্য লেবাননের জাতীয় সমন্বয়কারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এজাদিন বলেন, “অসংখ্য শিশু গুরুতর আঘাত পেয়েছে এবং তাদের একাধিক অস্ত্রোপচার করা লেগেছে; কেউ কেউ তাদের হাত-পা বা চোখ হারিয়েছে। তিনি আরও যোগ করেন, এর মানে হলো বিশেষায়িত মনস্তাত্ত্বিক, আবেগীয় এবং সামাজিক সহায়তার পাশাপাশি তাদের বছরের পর বছর ধরে চিকিৎসা ও পরিচর্যার প্রয়োজন হবে।

এজাদিন জানান, ইসরায়েলি যুদ্ধের সময় ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য হওয়া প্রায় ১২ লাখ মানুষের মধ্যে প্রায় ৩ লাখ ৬০ হাজার শিশুই বাস্তুচ্যুত হয়েছে। যে এলাকাগুলোতে তারা আশ্রয় নিয়েছিল সেখানেও পরে আক্রমণ চালানো হলে অনেক শিশু একাধিকবার বাস্তুচ্যুত হতে বাধ্য হয়।

তিনি বলেন, বাস্তুচ্যুতির পথে কিংবা তাদের বাড়িঘর থেকে জোরপূর্বক তাড়িয়ে দেওয়ার সময় কিছু শিশুকে তাদের পরিবারের সাথেই লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল।

তিনি সতর্ক করে বলেন, শিশুদের ক্ষেত্রে এই পরিণতি কেবল শারীরিক আঘাতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এতে অদৃশ্য ক্ষত সৃষ্টি হচ্ছে যা তাদের জীবনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে। ক্ষয়ক্ষতি, দীর্ঘস্থায়ী ভয় এবং নিরাপত্তার অব্যাহত অভাব দূর করতে শত শত হাজার হাজার শিশুর দীর্ঘমেয়াদী মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসা এবং আবেগীয় ও সামাজিক সহায়তার পরিকল্পনা প্রয়োজন।

জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ বারবার লেবাননি শিশুদের ওপর ইসরায়েলি হামলার প্রভাব সম্পর্কে সতর্ক করেছে এবং সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে।

গত মে মাসে সংস্থাটি জানিয়েছিল, ১৭ এপ্রিলে ঘোষিত যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও অব্যাহত সহিংসতা, বাস্তুচ্যুতি এবং মানসিক ট্রমার কারণে লেবাননের শিশুরা সবচেয়ে চড়া মূল্য দিয়ে যাচ্ছে। সংস্থাটি সব পক্ষকে শিশুদের রক্ষা করা, আন্তর্জাতিক মানবিক আইন মেনে চলা এবং যুদ্ধবিরতি যাতে কার্যকর থাকে তা নিশ্চিত করার জন্য সব ধরনের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানায়।

লেবানন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২ মার্চ থেকে লেবাননে হামলা চালিয়ে আসছে ইসরায়েল। যাতে ৪ হাজার ৩৬২ জন নিহত ও ১২ হাজার ৩৭৮ জন আহত হয়েছেন এবং ১০ লাখেরও বেশি মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন।

ইসরায়েল এখনও দক্ষিণ লেবাননের বেশ কিছু এলাকা দখল করে রেখেছ যার কয়েকটি কয়েক দশক ধরে এবং অন্যগুলো ২০২৩-২০২৪ সালের যুদ্ধের সময় দখল করা হয়েছিল। চলতি অভিযানে ইসরায়েলি বাহিনী লেবাননের ভূখণ্ডের ১০ কিলোমিটারের বেশি ভেতরে অগ্রসর হয়েছে।