পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র দিয়েই পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়েছেন ফটিকছড়ির দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন প্রকাশ গলাকাটা মোবারক। পুলিশের অভিযানের সময় একটি বাড়ির ফলস ছাদে লুকিয়ে থেকে গুলি চালান তিনি।
পরে পাল্টা গুলির মুখে তার পিস্তলের গুলি আটকে গেলে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। বুধবার (২৬ আগস্ট) ভোরে ফটিকছড়ির লেলাং ইউনিয়নের শাহনগর এলাকার একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে তিন সহযোগীসহ মোবারককে গ্রেপ্তার করা হয়।
এ সময় তাদের কাছ থেকে তিনটি পিস্তল, ২৩ রাউন্ড পিস্তলের গুলি ও চারটি শটগানের গুলি উদ্ধার করা হয়। অভিযানে সন্ত্রাসীদের গুলিতে চট্টগ্রাম জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কাজী মো. তারেক আজিজসহ পাঁচ পুলিশ সদস্য আহত হন।
আহত অন্যরা হলেন—ফটিকছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রবিউল আলম খান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের দেহরক্ষী কনস্টেবল মামুনুর রশিদ এবং ফটিকছড়ি থানার কনস্টেবল শাহ নেওয়াজ ও সাদ্দাম হোসেন। তারা প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন। পুলিশ জানিয়েছেন, মোবারক বর্তমানে কারাগারে থাকা সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ইমন প্রকাশ ডেভিড ইমনের সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে পরিচিত। ডেভিড ইমন বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর অন্যতম সহযোগী।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মো. মাসুদ আলম বলেন, মোবারক একজন দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী। ফটিকছড়ি ও রাউজানের দুর্গম পাহাড়ি এলাকাকে তিনি নিরাপদ আস্তানা হিসেবে ব্যবহার করতেন। গোপন তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে তাকে সহযোগীদেরসহ গ্রেপ্তার করা হয়েছে। রাউজানে যুবদল নেতা মাসুদ হত্যাসহ বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা মোবারক স্বীকার করেছেন।
এদিকে গত ২৯ জুলাই ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তারের পর তার কাছ থেকে মোবারকের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়। এরপর ফটিকছড়ির দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় কয়েক দফা অভিযান চালানো হলেও তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। সর্বশেষ গত সোমবার ফটিকছড়ির কাঞ্চননগরের বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় অভিযান চালিয়ে মোবারকের সহযোগী মো. আরাফাত, মো. মুন্না, ইকবাল ও বাবুলকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর পাহাড়ি এলাকায় নিজেকে নিরাপদ মনে না করে মোবারক লেলাং ইউনিয়নের শাহনগর এলাকায় পূর্বপরিচিত একটি বাড়িতে আশ্রয় নেন।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কাজী মো. তারেক আজিজ বলেন, মোবারক ওই বাড়িতে অবস্থান করছেন বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর মঙ্গলবার দিবাগত রাত ৩টার দিকে পুলিশ বাড়িটি চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। বাড়িটির দরজা ছিল লোহার। বারবার ডাকাডাকি করেও ভেতর থেকে দরজা খোলা হয়নি। এর আগে নোয়াখালীতে সন্ত্রাসী রায়হানকে গ্রেপ্তারের অভিযানের সময় তিনি বাড়ির ছাদ টপকে পালিয়ে গিয়েছিলেন। একইভাবে মোবারকও ছাদ দিয়ে পালাতে পারেন, এমন আশঙ্কায় পুলিশ সদস্যরা বাড়ির দেয়াল টপকে ছাদেও অবস্থান নেন।
তিনি আরও বলেন, প্রায় দেড় ঘণ্টা অপেক্ষার পর স্থানীয় লোকজনের উপস্থিতিতে লোহার দরজা ভেঙে পুলিশ বাড়িতে প্রবেশ করে। তখন সময় প্রায় ভোর সাড়ে ৪টা। পুলিশ সদস্যরা বাড়িতে ঢুকে প্রথমে ওয়াশরুমের ওপরে থাকা ফলস ছাদে মোবারকের সহযোগী রায়হানকে দেখতে পান। তাকে সেখান থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে একইভাবে ফলস ছাদের ভেতর থেকে নাছির ও ফরিদকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর সতর্কতার সঙ্গে বাড়ির ভেতরের একটি কক্ষে অভিযান চালানো হয়। ওয়াশরুমের ফলস ছাদের ওপর মোবারক লুকিয়ে আছেন বলে নিশ্চিত হয় পুলিশ।
পুলিশ সদস্যরা কক্ষে প্রবেশ করতেই মোবারক তার হাতে থাকা ব্রাজিলের তৈরি তরাস পিস্তল দিয়ে গুলি ছুড়তে শুরু করেন। পুলিশও পাল্টা গুলি চালায়। মোবারক একে একে ছয় রাউন্ড গুলি করেন। পুলিশ পাল্টা গুলি করে সাত রাউন্ড। এ সময় একটি গুলি অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কাজী মো. তারেক আজিজের কানের পাশ দিয়ে চলে যায়। সপ্তম গুলি ছোড়ার সময় মোবারকের পিস্তল আটকে যায়। পরে তাকে ফলস ছাদ থেকে নামিয়ে গ্রেপ্তার করা হয়।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কাজী মো. তারেক আজিজ বলেন, মোবারকের কাছ থেকে উদ্ধার করা পিস্তলটি ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট চট্টগ্রাম নগরের কোতোয়ালী থানা থেকে লুট হওয়া পুলিশের অস্ত্র। মোবারককে গ্রেপ্তারের পর তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ফটিকছড়ি ও রাউজানে অস্ত্র উদ্ধারে বুধবার রাত ১০টা পর্যন্ত অভিযান চালানো হয়েছে।
এদিকে মোবারক গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ফটিকছড়ি, রাউজান ও চট্টগ্রাম নগরে স্বস্তি ফিরেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। পুলিশের তথ্যমতে, চাঁদা না দেওয়ায় গত ১৪ মে ফটিকছড়ির কাঞ্চননগরের ব্যবসায়ী মো. আবছার উদ্দিন চৌধুরীর বাড়িতে সহযোগীদের নিয়ে গুলি চালানোর অভিযোগ রয়েছে মোবারকের বিরুদ্ধে। ওই ঘটনার পর থেকে আতঙ্কে এলাকা ছেড়ে ছিলেন ব্যবসায়ী আবছার।
তিনি বলেন, মোবারকের ভয়ে এলাকার মানুষ আতঙ্কে থাকতেন। তাকে গ্রেপ্তারের খবর স্বস্তির। তিনি যেন আর বেরিয়ে এসে এলাকায় সন্ত্রাস সৃষ্টি করতে না পারেন, সেটিই স্থানীয়দের প্রত্যাশা।



মন্তব্য করুন