তিস্তা নদী আর নেই

0
231

সময়ের পাতা ডেস্ক: তিস্তা ভারতের সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য ও বাংলাদেশের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত একটি নদী। সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি বিভাগের প্রধান নদী তিস্তা। একে সিকিম ও উত্তরবঙ্গের জীবনরেখাও বলা হয়। সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গের উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার পর বাংলাদেশে প্রবেশ করে তিস্তা ব্রহ্মপুত্র নদের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড বা ‘পাউবো’ কর্তৃক তিস্তা নদীর প্রদত্ত পরিচিতি নম্বর উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের নদী নং ৫২।

তবে বর্তমানে তিস্তা যেন এখন আর কোনো নদী নয়, একটি মরা খাল। ভারতের গজলডোবা নামক স্থানে প্রবেশ মুখে ও লালমনিরহাটের দোয়ানিতে ব্যারাজ নির্মাণ করে এ নদীর উচ্ছল দুর্বার গতিকে মানুষ রোধ করে দিয়েছে। বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন ক্যানেলের মাধ্যমে তিস্তার স্রোত ঘুরিয়ে দিয়ে তার বুক থেকে তুলে নেয়া হয়েছে পানি। মরে গেছে নদী তিস্তা। এ নদীর পাড়ে দাঁড়ালে এখন শুনতে পাওয়া যায় ক্ষীণকায় তিস্তার দীর্ঘশ্বাস। দীর্ঘ এ তিস্তার বুকজুড়ে শুধুই ধু-ধু বালুচর। প্রতিদিনই পানি কমতে থাকায় আশা-নিরাশার কবলে পড়েছে এক সময়ের প্রমত্তা তিস্তা। তিস্তার নাব্যতা এতটাই হ্রাস পেয়েছে যে আসন্ন রবি মওসুমে দেশের সর্ববৃহৎ সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজের সেচ কার্যক্রম চালানোই কঠিন হয়ে পড়বে। প্রতিদিনই পানি কমছে। নদীর বুকভরা বালুচর। কোথাও সামান্য পানি আবার কোথাও দিগন্তজোড়া বালুচর। ব্যারাজ থেকে শুরু করে তিস্তার বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে পানি না থাকায় হতাশ হয়ে পড়েছেন ব্যারাজের সুবিধাভোগী কৃষকেরা। তারা বলছেন বার বার দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকে ব্যারাজে পানি প্রবাহের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হলেও আজো কোনো সুরাহা না হওয়ায় ব্যারাজের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র মতে, ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহেই তিস্তার পানি প্রবাহ এ যাবৎকালের সর্বনি¤œ পর্যায়ে নেমে আসে। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ধরে রাখতে যেখানে প্রয়োজন চার হাজার কিউসেক পানি, সেখানে বর্ষা শেষ না হতেই ব্যারাজ এলাকায় পানি পাওয়া যাচ্ছে মাত্র তিন হাজার কিউসেক। গত ১৯ ডিসেম্বর ব্যারাজ পয়েন্টে পানির প্রবাহ ছিল ২ হাজার ৮০০ কিউসেক। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, পর্যাপ্ত পানির অভাবে তিস্তা ব্যারাজের সেচ কার্যক্রম ভেঙে পড়বে। তাই আসন্ন সেচ মওসুমে তিস্তার পানির হিস্যা জরুরি হয়ে পড়েছে। আর ক’দিন পরই সেচ নির্ভর ইরি-বোরো ও রবি আবাদের কার্যক্রম শুরু হবে। কৃষকদের মতে বোরো ধান রোপণ থেকে গাছের শীষ হেলে না পড়া পর্যন্ত সেচ দেয়ার উপযুক্ত সময়। সে পর্যন্ত বোরো আবাদের জন্য সেচ অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে তিস্তা ব্যারাজ সেচ প্রকল্পের আওতাভুক্ত এলাকার কৃষকেরা তিস্তার সেচকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ব্যারাজে প্রকৃত পক্ষে পানির প্রয়োজন প্রায় ২০ হাজার কিউসেক।

তিস্তা ব্যারাজ সেচ প্রকল্পের কর্তব্যরত ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান জানান, তিস্তা ব্যারাজের সেচের পানি দিয়ে আসন্ন বোরো আবাদে লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর ও দিনাজপুর জেলার প্রায় ৫৪ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ দেয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ হয়েছে। এর মধ্যে লালমনিরহাটে ২ হাজার ৩০০, নীলফামারী জেলায় ২৫ হাজার ৫০০ হেক্টরে, দিনাজপুর জেলায় ২ হাজার ও রংপুর জেলায় ২৪ হাজার ৫০০ হেক্টর।

সূত্র মতে, সেচ প্রকল্পের পানিসহ তিস্তাকে বাঁচিয়ে রাখতে ন্যূনতম পানির প্রয়োজন প্রায় ২০ হাজার কিউসেক। অভিন্ন তিস্তার উজানে বিজনবিভূই এলাকায় ভারত গজলডোবা নামক ব্যারাজ নির্মাণ করে ১৯৮৭ সাল থেকে তিস্তার পানি একতরফাভাবে প্রত্যাহার করে আসছে। গত বছরের এক জরিপে জানা যায়, সর্বসাকুল্যে তিস্তাতে পানি পাওয়া যায় ১ নভেম্বর ৪ হাজার ৮৮৪, ৩০ নভেম্বর ৪ হাজার ৩০৫ এবং সর্বশেষ ১৯ ডিসেম্বর ব্যারাজের মূল গেটের পানি প্রবাহ ছিল মাত্র ২ হাজার ৮০০ কিউসেক। যা দিয়ে তিস্তা ব্যারাজের সেচপ্রকল্পের সেচ কার্যক্রম চালানো কোনোক্রমেই সম্ভব নয়।

পানি উন্নয়ন বোর্ড ডালিয়া পওর বিভাগের এই প্রকৌশলী আরো জানান, পর্যাপ্ত পানির অভাবে তিস্তা ব্যারাজের সেচ কার্যক্রম কোনোভাবেই চালু করা সম্ভব হবে না। কারণ ভরা বর্ষায় ব্যারাজ এলাকায় যেখানে পানি থাকার কথা ৩০ হাজার কিউসেক, সেখানে বর্ষা শেষ না হতেই ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহেই পানিশূন্য হয়ে পড়েছে ব্যারাজ এলাকা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, তিস্তা সেচপ্রকল্পের প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ের সেচ কার্যক্রম চালাতে তিস্তায় পানির প্রয়োজন হবে শুষ্ক মওমুমে প্রায় ২০ হাজার কিউসেক। কারণ দ্বিতীয় পর্যায়ের সেচ ক্যানেল বগুড়া পর্যন্ত নেয়া হচ্ছে।

কৃষি বিভাগ সূত্র মতে, আসন্ন মওসুমে রংপুর বিভাগের আট জেলায় ৯ লাখ ৮৫ হাজার ৪১০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই পরিমাণ জমিতে বোরো আবাদে বিদ্যুৎ, ডিজেল ও পা চালিত সেচযন্ত্র ব্যবহার করা হবে মোট তিন লাখ ৬৬ হাজার ৭৬১টি। এর মধ্যে ডিজেল চালিত গভীর নলকূপ রয়েছে ১৪৯টি, অগভীর নলকূপ ২ লাখ ৮৫ হাজার ৭০৪টি, পাওয়ার পাম্প ৮৪৩টি ও বিদ্যুৎ চালিত ৫৬ হাজার ৩৮২টি সেচযন্ত্র এবং ২৭ হাজার ৬৮৩টি পা চালিত সেচযন্ত্র।