স্কুলে নয় ১২বছর ধরে শেকলবন্দি জীবন পার করছে ঝিনাইগাতীর আল্পনা

0
4

শেরপুর প্রতিনিধিঃ তৃতীয় শ্রেণীতে পড়তো শেরপুরের ঝিনাইগাতীর গুরুচরণ দুধনই গ্রামের আল্পনা। বয়স তখন আট বছর। কিন্তু হঠাৎ সে অসুস্থ হয়ে পড়ে। এরপর তাকে নানা স্থানে চিকিৎসা করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু দারিদ্রতার কারণে চিকিৎসা কার্যক্রম চালাতে পারছে না তারা। তাই স্কুলে আর যাওয়া হলো না আল্পনার। এখন তার জীবন কাটছে শেকলে বন্দি অবস্থায়। এভাবেই ১২ বছর ধরে শেকলে বন্দি জীবন চলছে যুবতী আল্পনা আক্তার (২০) এর।

আল্পনার বাবা শেরপুরের ঝিনাইগাতীর কাংশা ইউনিয়নের গুরুচরন দুধনই গ্রামের ছিদ্দিক আলী ওরফে চাক্কু মিয়া একজন ভুমিহীন দরিদ্র মানুষ। সেও আবার অসুস্থ। থাকার ঘর পর্যন্ত ছিলোনা। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর একটি ঘর পেয়েছে সে। ওই ঘরের একটি কক্ষেই শেকলে বন্দি হয়ে থাকছে আল্পনা।

মা আছিয়া পরের বাড়ীতে সাহায্য নিয়ে এসে সন্তানদের নিয়ে সংসার চালাচ্ছে অনেক কষ্টে। ঘরে বন্দি থাকারপর অনেক সময় শেকলসহ বেরিয়ে আসে তখন স্থানীয়দের মধ্যে ভয় সৃষ্টি হয়। তাকে ওই পরিবারটিও আছে অনেক কষ্টে। অথচ সঠিক চিকিৎসা দিলে ভালো হতে পারে আল্পনা। ফিরে আসতে পারে স্বাভাবিক জীবনে।

আল্পনার বাবা ছিদ্দিক আলীর এক ছেলে ও পাঁচ মেয়ের মধ্যে আল্পনা তৃতীয়। ২০০১ সালে আল্পনার জন্ম হয়। ২০০৮ সালে ঢাকায় বোনের বাসায় বেড়াতে যায় আল্পনা। সেখানে হঠাৎ করেই জ্বর ওঠে তার শরীরে। এরপর থেকেই মানসিক সমস্যা দেখা দেয় তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া এই মেয়ের। এরপর চিকিৎসা করালেও তেমন কোনো ফল মেলেনি, বরং বাড়তেই থাকে অসুখ। শেষমেশ ২০০৯ সাল থেকে শেকলে বন্দি করে রাখে পরিবার।

আল্পনার বাবা সিদ্দিক আলী বলেন, ‘আমি আমার মেয়েডারে চিকিৎসা করাইতে অনেক টেহা খরচ করছি। এখন আর টেহা নাই। মেয়ের চিকিৎসার খরচ জোগাইতে আমি ১০ শতাংশ জমি, পাঁচটা গরু বিক্রি করেছি। ২০ হাজার টেহা ঋণও করেছি। আমার ইচ্ছা থাকার পরও টেহার অভাবে মেয়েকে বালা কোনো ডাক্তার দেহাতে পারতাছি না।

আল্পনার মা আছিয়া বেগম বলেন, ‘সরকার আমাদের এডা ঘর দিছে। ওই ঘরের এডা রুমে আল্পনা থাকে। এহন পর্যন্ত আমার মেয়ে কোনো প্রতিবন্ধী ভাতার কার্ড পায়নি। আমার মেয়ের যন্ত্রণায় আমি শান্তিমতো খাইতে পারি না, রান্নাও করতে পারি না। অতিষ্ঠ করে ফেলেছে আমাকে।’ আমি এহন কি করমু ভাইবা পারতাছি না।

গুরুচরন দুধনই গ্রামের মেম্বার হযরত আলী বলেন, ‘আমি অনেক দিন থেকে মেয়েটিকে শেকলে বন্দি অবস্থায় দেখছি। আগে ভালো ছিল। চিকিৎসা ঠিকমতো করায়নি, করালে হয়তো মেয়েটা সুস্থ হতো।’ আমরা এলাকাবাসী কিছু টাকা উঠাইয়া দিছিলাম ওই টাকা দিয়ে তো কিছুই হয়নাই। এ এলাকাটি গরিব, তাই মানুষও টাকা দিতে পারছে না। আমরা চাই সরকারীভাবে এ মেয়েটির চিকিৎসা করানো হউক।

ওই গ্রামের উসমান গণি বলেন, ‘শুনলাম আল্পনা মেয়েটা একদিন ঢাকায় গেল। সেখানে জ্বর নিয়ে আবার বাড়িতে আসার পর থেকেই মানসিক সমস্যা শুরু হয়েছে। তার বাবা কয়দিন চিকিৎসা করাল কিন্তু ভালো হয়নি। এ জন্য শেকলে বেঁধে রেখেছে। সঠিকমতো চিকিৎসা পেলে হয়তো ভালো হয়ে সুস্থ জীবনে ফিরত।’

ঝিনাইগাতী উপজেলা চেয়ারম্যান এস এম ওয়ারেজ নাঈম বলেন, ‘আমরা আল্পনার পরিবারের কথা শুনে সরকার থেকে একটি দুর্যোগ সহনীয় ঘর দিয়েছে। কিন্তু প্রতিবন্ধী ভাতা এখনো পায়নি। আমরা শিগগিরই আল্পনার জন্য মাসে মাসে ভাতার ব্যবস্থা করে দিবো। এ ছাড়া তার চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন জায়গায় কথা বলব। আল্লাহর রহমতে স্বাভাবিক জীবনে ফিরবে সে। আমরা সার্বিকভাবে আল্পনা ও তার পরিবারের পাশে আছি এবং থাকব ইনশাআল্লাহ্।’

শেরপুরের সিভিল সার্জন ডা. এ কে এম আনোয়ারুর রউফ বলেন, আমরা আল্পনার কথা সাংবাদিকদের মাধ্যমে জানলাম। ‘শেকলে বন্দি করে রাখা এটা অমানবিক কাজ। মানসিক সমস্যার চিকিৎসা তো আছে। আমারা যোগাযোগ করে ওই মেয়েকে বিনা খরচে