“বেকারত্ব আমার পরিচয় নয়”
বাসায় কয়েকদিন ধরে একটা কথাই ঘুরছে—
ছেলেকে এবার বিয়ে দিতে হবে। আম্মা প্রায়ই আমাকে বলেন, “আব্বা ও আব্বা, বয়স তো কম হলো না। ২৪–২৫ তো হবেই বটে। এবার একখান বউমা আউন লাগবো।”
আমি চুপচাপ শুনছিলাম। হঠাৎ আম্মা আমাকে বললেন,
“পুত রে, তুই একটা চাকরি কর। বেকার থাকলে মানুষ মাইয়া দিবো না।” আমি মৃদু হেসে বললাম, “আম্মা, আমি তো একেবারে বেকার না। টুকটাক কাম করি, যা কামাই করি তা দিয়েই তো চলি।”
আম্মা বললেন, “ওই টুকটাক কাম দিয়ে কি জীবন চলে? ভবিষ্যতে কী করবি?”
আমি বললাম, “আম্মা, চাকরি আমার ভালো লাগে না। আমি ব্যবসা করতে চাই।” আম্মা একটু রাগ করে বললেন,
“ব্যবসা করবি, মানুষরে চাকরি দিবি,এইসব বড় বড় কথা কইস না। আগে নিজের একটা চাকরি জোগাড় কর।” আমি শান্তভাবে বললাম, “আম্মা, আমি একদিন শুধু নিজের জন্য কাজ করব না। এমন একটা ব্যবসা দাঁড় করাব, যেখানে অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হবে। যারা আজ আমার মতো বেকার, তাদেরও কাজের সুযোগ দিতে চাই।”
আম্মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“পুত রে, স্বপ্ন দিয়া তো সংসার চলে না।” আমি মনে মনে বললাম, “ঠিকই, শুধু স্বপ্ন দিয়ে সংসার চলে না। কিন্তু স্বপ্ন ছাড়া বড় কিছু শুরু করাও যায় না।” আব্বাও বললেন,
“বেকার থাকলে মানুষের কাছে সম্মান থাকে না। তুই একটা চাকরি নে।” আমি আর কিছু বললাম না।
কয়েকদিন পর হঠাৎ মেয়ে পক্ষ থেকে সম্বন্ধ এলো। ঘটক এসে বলল, “ভাইজান, ছেলে তো দেখলেন। কেমন লাগলো?” মেয়ের বাবা আমার দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন,
“বাবা, তুমি কী করো?” আমি মাথা নিচু করে বললাম, “আমি টুকটাক কাজ করি। নিজের মতো করে চলার চেষ্টা করি।” তিনি আবার প্রশ্ন করলেন,
“স্থায়ী চাকরি আছে?” আমি চুপ। আমার সেই নীরবতাই যেন উত্তর হয়ে গেল। তিনি ধীরে ধীরে বললেন,
“ছেলে তো বেকার!” কথাটা খুব ছোট ছিল, কিন্তু আমার কানে অনেক বড় হয়ে বাজল। বেকার! একটা শব্দ,
যেন আমার সব স্বপ্ন, সব চেষ্টা, সব পরিশ্রমকে এক মুহূর্তে অস্বীকার করে দিল। মেয়ে পক্ষ চলে যাওয়ার পর আম্মা বললেন, “পুত রে, দেখছস? চাকরি ছাড়া মানুষ মাইয়া দিবো না। তুই আগে একটা চাকরি নে।”
আমি আম্মার দিকে তাকিয়ে বললাম, “আম্মা,আজ আমি বেকার—এটা সত্যি। কিন্তু আমি সারাজীবন বেকার থাকব—এটা সত্যি না।”
আম্মা চুপ করে রইলেন। আমি আবার বললাম,
“তুমি শুধু আমার ওপর একটু বিশ্বাস রাখো। আমি হয়তো আজ চাকরি খুঁজছি না, কিন্তু আমি এমন একটা কাজ দাঁড় করাতে চাই—যেখানে একদিন মানুষ আমার কাছে চাকরি চাইতে আসবে।” আম্মা কিছু বললেন না। শুধু আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। হয়তো তিনি তখনও পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারেননি। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি— সময় মানুষকে বদলায়। পরিশ্রম মানুষকে বদলায়। আর ধৈর্য একদিন স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করে। আজ কেউ যদি আমাকে বলে, “তুই তো বেকার!” আমি শুধু হাসি। কারণ আমি জানি, বেকারত্ব আমার বর্তমান হতে পারে, কিন্তু আমার পরিচয় নয়। একদিন নিজের পায়ে দাঁড়াব। একদিন নিজের ব্যবসা দাঁড় করাব। একদিন অন্যের কর্মসংস্থান তৈরি করব। আর সেদিন হয়তো যারা আজ আমাকে “বেকার” বলে, তারাই বলবে— “ছেলেটা স্বপ্ন দেখেছিল, আর স্বপ্নটা সত্যি করে দেখিয়েছে।”
কামরুজ্জামান কাজল
কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ
অনার্স প্রথম বর্ষ


মন্তব্য করুন