ভোরের আলো ফুটতেই গ্রামের বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েন তিনি। কারও গন্তব্য কয়েক কিলোমিটার দূরের কলেজ, কারও আবার মেস থেকে শ্রেণিকক্ষ। কারও হাতে বই, কারও কাঁধে ব্যাগের সঙ্গে পরিবারের দায়িত্বও। ক্লাসে বসে তারা ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেন। কেউ বিসিএস ক্যাডার হতে চান, কেউ শিক্ষক, কেউ আইনজীবী। কেউ স্বপ্ন দেখেন উদ্যোক্তা হওয়ার। আর কারও কাছে স্বপ্নটা আরও সহজ—একটি স্থায়ী চাকরি, যাতে বাবা-মায়ের মুখে হাসি ফোটানো যায়। এই তরুণদের অনেকের উচ্চশিক্ষার বড় ভরসা কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ। প্রত্যন্ত এলাকার নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য তুলনামূলক কম খরচে উচ্চশিক্ষার সুযোগ তৈরি করা এই প্রতিষ্ঠানটি তাই শুধু একটি কলেজ নয়। বহু পরিবারের কাছে এটি সন্তানকে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে দেওয়ার সবচেয়ে বাস্তব সুযোগ। কিন্তু সেই সুযোগের পথও সবসময় মসৃণ নয়।

স্বপ্নের সঙ্গে লড়াই বাস্তবতার

কলেজে ভর্তি হওয়ার পর একজন শিক্ষার্থীর লড়াই শেষ হয় না; বরং অনেক ক্ষেত্রে শুরু হয় নতুন লড়াই। বই, যাতায়াত, থাকা-খাওয়া, প্রযুক্তির ব্যবহার, পরীক্ষার প্রস্তুতি—প্রতিটি ক্ষেত্রেই অর্থনৈতিক সক্ষমতার প্রভাব পড়ে। কেউ পড়াশোনার খরচ চালাতে টিউশনি করেন। কেউ পরিবারের কাজে সহযোগিতা করতে গিয়ে পড়ার সময় কমিয়ে দেন। কেউ প্রয়োজনীয় বই কিনতে পারেন না। আবার কেউ আধুনিক প্রযুক্তি ও অনলাইন শিক্ষার সুবিধা থেকে পিছিয়ে থাকেন। তারপরও তারা এগিয়ে যেতে চান। কারণ তাদের কাছে শিক্ষাই জীবন বদলের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।

একই শ্রেণিকক্ষ, ভিন্ন বাস্তবতা

একই শ্রেণিকক্ষে বসা সব শিক্ষার্থীর বাস্তবতা এক নয়। কারও বাড়িতে পড়ার আলাদা জায়গা আছে, কারও নেই। কেউ প্রয়োজনীয় বই ও ইন্টারনেট সুবিধা পান, কেউ নির্ভর করেন সীমিত সম্পদের ওপর। কেউ পরীক্ষার আগে বাড়তি প্রস্তুতির সুযোগ পান, কেউ পড়াশোনার পাশাপাশি উপার্জনের চেষ্টা করেন। এই পার্থক্যগুলো অনেক সময় ফলাফল কিংবা ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার ওপরও প্রভাব ফেলে। তবু প্রত্যন্ত এলাকার একজন শিক্ষার্থী যখন সরকারি কলেজের শ্রেণিকক্ষে এসে বসেন, তখন তার সামনে সম্ভাবনার একটি নতুন দরজা খুলে যায়। সেই দরজাটি কতটা প্রশস্ত করা যাচ্ছে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

করিডোরে যে ভবিষ্যৎ হাঁটে

কলেজের করিডোরে প্রতিদিন যে তরুণদের দেখা যায়, তাদের প্রত্যেকের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি পরিবার, একটি সংগ্রাম এবং একটি স্বপ্ন। কেউ পরিবারের প্রথম উচ্চশিক্ষিত হওয়ার পথে। কেউ বাবা-মায়ের কষ্ট কমাতে চান। কেউ নিজের এলাকার মানুষের জন্য কাজ করতে চান। কেউ চান চাকরি খোঁজার পরিবর্তে অন্যদের চাকরি দেওয়ার মতো অবস্থানে যেতে। তাদের কেউ হয়তো একদিন প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকবেন। কেউ শিক্ষক হয়ে নতুন প্রজন্ম তৈরি করবেন। কেউ ব্যবসা বা উদ্যোক্তা হিসেবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবেন। আজ তারা শিক্ষার্থী। আগামী দিনে তারাই কুড়িগ্রামের পরিচয় বহন করবেন।

শুধু ডিগ্রি দিয়ে কি ভবিষ্যৎ তৈরি হয়?

বর্তমান বিশ্বে একটি সনদ অর্জন করাই সফলতার একমাত্র চাবিকাঠি নয়। প্রযুক্তিজ্ঞান, যোগাযোগ দক্ষতা, ইংরেজি ভাষা, নেতৃত্ব, সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা এবং বাস্তব কর্মক্ষেত্রের প্রস্তুতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে সরকারি কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্য নিয়মিত ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং, দক্ষতা উন্নয়ন কর্মশালা, তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ, গবেষণা, বিতর্ক, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং উদ্যোক্তা উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের শুধু পরীক্ষায় ভালো করার জন্য নয়, ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য প্রস্তুত করাই হওয়া উচিত উচ্চশিক্ষার অন্যতম লক্ষ্য। একটি বই, একটি বৃত্তি, একটি পরামর্শ। একজন শিক্ষার্থীর জীবনে বড় পরিবর্তনের জন্য সবসময় বড় কোনো উদ্যোগ প্রয়োজন হয় না। একটি প্রয়োজনীয় বই, একটি বৃত্তি, একটি প্রশিক্ষণ, একজন শিক্ষকের সঠিক পরামর্শ কিংবা একটি ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং সেশনও কখনো কখনো একজন তরুণকে নতুন পথ দেখাতে পারে। অর্থনৈতিক সংকটে মেধা যেন হারিয়ে না যায়—এটি নিশ্চিত করা শুধু শিক্ষার্থীর পরিবারের দায়িত্ব নয়; এটি প্রতিষ্ঠান ও সমাজেরও দায়িত্ব। কারণ একটি মেধাবী তরুণের পিছিয়ে পড়া মানে শুধু একটি ব্যক্তিগত স্বপ্নের মৃত্যু নয়। এর সঙ্গে হারিয়ে যেতে পারে একটি পরিবারকে বদলে দেওয়ার সম্ভাবনা, একটি সমাজকে এগিয়ে নেওয়ার সম্ভাবনা, এমনকি একটি জেলার ভবিষ্যতের সম্ভাবনাও।

প্রশ্নটা তাই আরও বড়, প্রশ্ন শুধু কতজন শিক্ষার্থী কলেজে পড়ছে?, প্রশ্ন হওয়া উচিত , কতজন মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে?, কতজন অর্থনৈতিক কারণে পিছিয়ে পড়ছে?, কতজন প্রয়োজনীয় বই, প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণ থেকে বঞ্চিত?কতজন উচ্চশিক্ষা শেষে কর্মজীবনের জন্য প্রস্তুত?, আর কতজন তরুণকে সামান্য সহযোগিতা করলে তারা আরও অনেক দূর যেতে পারত?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা বেশ জরুরি।

কারণ একটি জেলার উন্নয়ন শুধু রাস্তা, সেতু কিংবা ভবন নির্মাণে সীমাবদ্ধ নয়। সেই জেলার তরুণদের সম্ভাবনা কতটা বিকশিত হচ্ছে, সেটিও উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ সূচক। আজকের তরুণ, আগামী দিনের কুড়িগ্রাম। কুড়িগ্রামের তরুণদের স্বপ্ন ছোট নয়। তারা বড় হতে চায়। নিজেদের পরিবারকে বদলাতে চায়। সমাজের জন্য কাজ করতে চায়। দেশের জন্য কিছু করতে চায়। তাদের প্রয়োজন করুণা নয় প্রয়োজন সুযোগ। প্রয়োজন এমন একটি শিক্ষার পরিবেশ, যেখানে একজন কৃষকের সন্তান, দিনমজুরের সন্তান কিংবা নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের মেধাবী শিক্ষার্থীও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে পিছিয়ে পড়বে না। একটি সরকারি কলেজের ভবন হয়তো ইট-পাথরের তৈরি। কিন্তু সেই ভবনের শ্রেণিকক্ষে যখন হাজারো তরুণ ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে, তখন প্রতিষ্ঠানটি আর শুধু একটি কলেজ থাকে না। সেটি হয়ে ওঠে একটি জেলার সম্ভাবনার কেন্দ্র।

কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের করিডোরে প্রতিদিন যে পায়ের শব্দ শোনা যায়, সেগুলো শুধু শিক্ষার্থীদের চলার শব্দ নয়।সেগুলো আগামী দিনের কুড়িগ্রামের পদচারণা। তাদের স্বপ্ন কতটা দূর যাবে, তা শুধু তাদের মেধার ওপর নির্ভর করে না—নির্ভর করে আমরা তাদের জন্য কতটা সুযোগ তৈরি করতে পারছি তার ওপরও।

মোঃ খুরশীদ আলম
অনার্স ২০২৫-২৬
বাংলা বিভাগ
কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ