“দেড় মাস ধরে ছেলেকে খুঁজছি। নিখোঁজ হওয়ার পর থানায় অভিযোগ জানাতেই তিন দিন ঘোরাঘুরি করেছি। এরপর জিডি নিয়েছে। কিন্তু তারপর পুলিশ আর আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে নাই। উল্টো খোঁজ নিতে গেলে আমাকেই বলেছে, ‘তোমার বাচ্চা হারিয়ে গেলে আমরা কী করব?’ টাকা-পয়সা নাই, তার পরও ১২ বছরের ছেলেটার খোঁজে ধারদেনা করে নিখোঁজের বিজ্ঞপ্তি দিয়েছি। আমার ছেলেটাকে আমি ফিরে পেতে চাই।”

ঢাকার রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) রবিবার এক সংবাদ সম্মেলনে এভাবেই নিজের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরেন ঝিনাইদহের খাজুরা গ্রামের কাপড় বিক্রেতা হোসেন আলী। নিখোঁজ শিশুদের সন্ধান, নিরাপদ প্রত্যাবর্তন ও কার্যকর রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপের দাবিতে এদিন ‘আমার সন্তান কোথায়?’ শীর্ষক এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে জিরো মিসিং চিলড্রেন।

সংবাদ সম্মেলনে সন্তান খুঁজে না পাওয়ার অসহায়ত্ব তুলে ধরে ৪০টি পরিবারের সদস্যরা। ১১৫ দিন ধরে নিখোঁজ তিন বছরের শিশু সামিয়ার মা বলেন, বাসার সামনে খেলতে গিয়ে শিশুটি হারিয়ে যায়। এরপর তাকে সামাজিক মাধ্যমে ‘মিঠাই’ নামের টিকটকে দেখা গেছে। বিষয়টি পুলিশকে জানানোও হয়েছে। কিন্তু কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। মামলাটি প্রথমে ডিবি ও পরে পিবিআইতে গেলেও সন্তানের সন্ধান মেলেনি। একইভাবে সাভারের বলিয়ারপুরে নিজ বাসা থেকে গত ৩০ জুলাই নিখোঁজ হয় চার বছরের যাদব কর্মকার। শিশুটির মা বাসনা কর্মকারের অভিযোগ, ফোনে হুমকি পাওয়ার পর সন্দেহভাজনদের তথ্য পুলিশকে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তদন্তে কার্যকর অগ্রগতি নেই। এক মাস ধরে সন্তানকে ফিরে পাওয়ার আশায় ছুটছেন তিনি।

নিখোঁজের জিডি ১৫ হাজার, খোঁজ মিলেছে ১৩ হাজারের 

শুধু সংবাদ সম্মেলনের এই ৪০টি পরিবার নয়—নিখোঁজ শিশুকে খুঁজে ফিরছে সারা দেশের আরও অনেক পরিবার। খোদ পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাবমতেই চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত বিভিন্ন থানায় শিশু নিখোঁজ-সংক্রান্ত জিডি হয়েছে ১৫ হাজার ৭১৭টি। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। এখনও নিখোঁজ ২ হাজার ৩৮ জন। প্রশ্ন উঠেছে, এত বিপুল সংখ্যক শিশু কি নিছক ভুলবশত বা পথ হারিয়েই হারিয়ে যাচ্ছে? এ নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন অভিভাবকরা। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে সাধারণ পরিবারগুলোতে। এক্ষেত্রে শিশু পাচারকারী কিংবা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কর্তনকারী কোনো চক্র কাজ করছে কি না তা খতিয়ে দেখারও তাগিদ দিয়েছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা।

যা জানাচ্ছে পুলিশ 

অবশ্য পুলিশের দাবি, শিশু নিখোঁজের ঘটনায় এত ব্যাপক সাধারণ ডায়রি নতুন ঘটনা নয়। প্রতিবছরই এ রকম নিখোঁজ জিডি হয় এবং এর মধ্যে বেশিরভাগই উদ্ধার হয়ে থাকে। অনেকে অভাবের তাড়নায় সন্তান বিক্রি করেও সাধারণ ডায়রি করেন। হাসপাতাল থেকেও শিশু চুরির ঘটনা ঘটে থাকে। সেগুলো প্রাথমিক অবস্থায় সাধারণ ডায়রি করা হয়। পরে উদ্ধার করা গেলে পুলিশ আইনগত ব্যবস্থা নিয়ে থাকে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি মিডিয়া এএইচএম শাহাদাত হোসাইন বলেন, “শিশু নিখোঁজ সম্পর্কে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স স্থানীয় পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট থানার মাধ্যমে বিষয়টি যাচাই-বাছাই করেছে। এতে দেখা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত শূন্য থেকে নয় বছর বয়সী শিশুর নিখোঁজ জিডি হয়েছে ৪৭৪, উদ্ধার হয়েছে ৪০৬ জন, উদ্ধার হয়নি ৬৮ জন। একই সময়ে ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু নিখোঁজ হয়েছে ১৫ হাজার ২৪৩, উদ্ধার হয়েছে ১৩ হাজার ২৭৩ জন, উদ্ধার হয়নি ১ হাজার ৯৭০ জন। আলোচ্য সময়ে মোট ১৫ হাজার ৭১৭ নিখোঁজ শিশুর মধ্যে উদ্ধার হয়নি ২ হাজার ৩৮ জন, যা মোট নিখোঁজের শতকরা ১৩ ভাগ।”

তিনি বলেন, “শূন্য থেকে ৯ বছরের শিশুরা সাধারণত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে অপরিচিত স্থানে ঘুরতে গিয়ে পথঘাট ভুলে গিয়ে, পরিবারের সদস্যদের নাম-ঠিকানা বলতে না পারায় এবং একাকী বাসায় ফিরতে গিয়ে অন্য স্থানে চলে যাওয়ার কারণে নিখোঁজ হয়। আবার ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সীরা অভিমান করে, পড়ালেখার চাপ, অনৈতিক কাজে জড়িয়ে লজ্জার ভয়ে পালিয়ে থাকা, স্বাধীন জীবন-যাপনের আকাঙ্ক্ষা, পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে অর্থ বা অন্য কোনো সুবিধা আদায়ের কৌশল, পারিবারিক কলহ ও অশান্তি এবং বন্ধু বা সহপাঠীদের প্রভাব নিখোঁজ হয়।”

তিনি জানান, এরআগে ২০২৩ সালেও নিখোঁজ জিডি হয়েছে ১৭ হাজার ৮০৮টি। এর পর ২০২৪ সালে ১৬ হাজার ৪১৪টি এবং ২০২৫ সালে ২২ হাজার ৫৫০টি নিখোঁজ জিডি হয়েছে। পুলিশ প্রতিটি ঘটনায় গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করছে। এখনও যারা নিখোঁজ রয়েছে তাদের উদ্ধারে পুলিশের চেষ্টা অব্যহত রয়েছে।

পুলিশের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “অপ্রাপ্ত বয়স্ক অনেক কিশোর-কিশোরী এখন টিকটক ও সামাজিক মাধ্যমে অপরিচিত অনেকের সঙ্গে সম্পর্কে জড়াচ্ছে। অনেকে পরিবারের কাউকেই না জানিয়ে ঘর ছাড়ছে। এসব ঘটনায় সাধারণ সাধারণ ডায়রি করা হয়। পরে পুলিশ শিশুটিকে উদ্ধারের পর মামলা করতে চাইলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দুপক্ষই আপস করে ফেলে। আবার অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যরা ওই অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েটিকে ঘরে ফিরিয়ে নেয় না। তারা জিডি করেই দায় সারেন। পুলিশ এখন এ ধরনের ঘটনাই বেশি পাচ্ছে।”

যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা 

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হকবলেন, “শিশু নিখোঁজের ক্রমবর্ধমান ঘটনার পেছনে শুধু পারিবারিক বা মানসিক কারণ নয়, বরং সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে।”

তিনি বলেন, “বাংলাদেশে শিশু নিখোঁজের ঘটনা ক্রমাগত বাড়ছে। শিশু নিখোঁজ হওয়ার ক্ষেত্রে কয়েক ধরনের পরিস্থিতি রয়েছে। যার মধ্যে অন্যতম হলোÑ শিশু পাচারকারীদের সক্রিয়তা।”

ড. তৌহিদুল হক উল্লেখ করেন, “পাচার হওয়া শিশুদের বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজে ব্যবহার করা হয়। জোর করে যৌনকর্মে বাধ্য করা হয়, কন্যাশিশুদের দেশের বাইরে সেক্স হাউসে বিক্রি করা হয়। গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিক্রি করা হয়। নির্দিষ্ট সময় বন্দি রেখে শিশুদের বিকলাঙ্গ করে ভিক্ষা করানো হয়। এখন শিশুদের ব্যবহার করে অশ্লীল কনটেন্টও তৈরি করা হচ্ছে।” এ ছাড়া পারিবারিক দূরত্ব ও মনোমালিন্যের কারণেও অনেক শিশু প্রতিশোধপরায়ণ ও হতাশ হয়ে ঘর ছাড়ে বলে মনে করেন তিনি।

ড. তৌহিদুল হক অভিভাবকদের উদ্দেশে বলেন, “শিশু নিখোঁজ হলে অধিকাংশ মানুষ প্রথমে নিজেদের মধ্যে কিংবা আত্মীয়স্বজন ও আশপাশে খোঁজাখুঁজি করেন। ফলে অনেক সময় দেরি হয়ে যায়। আমরা বলব, প্রথমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে যান, তারপর নিজেদের মধ্যে খোঁজ নিন।”

নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের বিষয়ে তিনি বলেন, “জনঘনত্ব বেশি, তাই স্কুলের সামনে এবং খেলার মাঠ এলাকায় এসব ঘটনা বেশি ঘটছে। তাই এসব স্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি বাড়ানো জরুরি।”

এ বিষয়ে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, “এত সংখ্যক শিশু নিখোঁজ হওয়া মোটেও স্বাভাবিক নয়। বরং এটি গভীর উদ্বেগের কারণ।’ তিনি মনে করেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণেই এমন ঘটনা ঘটছে। তিনি বলেন, ‘সরকারকে এই ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি শিশু নিখোঁজের পেছনে থাকা চক্র বা নেটওয়ার্ককে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।”

এ বিষয়ে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, “প্রথমত, নিখোঁজ শিশুদের খুঁজে বের করতে সরকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত, কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। এত বিপুল সংখ্যক শিশু নিখোঁজ থাকা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। প্রতিটি নিখোঁজ শিশুর সন্ধানে দ্রুত তদন্ত ও অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করার পাশাপাশি এ ধরনের ঘটনা যাতে আর না ঘটে, সেজন্যও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। নিখোঁজ শিশুদের খুঁজে বের করতে সরকার স্কুল, মাদ্রাসা, অভিভাবক, স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সহযোগিতা নিতে পারে। একই সঙ্গে নিখোঁজ শিশুদের তথ্য দ্রুত আদান-প্রদান ও অনুসন্ধানের জন্য একটি কার্যকর সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

“দ্বিতীয়ত, মাদকাসক্তি, শিশু পাচার, সহিংসতা, যৌন নির্যাতন এবং অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে শিশুরা যে বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকে, সে বিষয়ে অভিভাবক ও শিক্ষকদের সচেতন করতে সরকারকে নিয়মিত ও কার্যকর কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। শিশুদের শুধু সতর্ক করলেই হবে না, তাদের বয়স, মানসিক বিকাশ ও বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ শিক্ষা দিতে হবে। বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের জন্য সরকারি স্কুল ও কলেজে মানসিক স্বাস্থ্য, আত্মসুরক্ষা, নিরাপদ আচরণ এবং সহায়তা পাওয়ার উপায় বিষয়ে বয়সোপযোগী শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা উচিত। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাউন্সেলিং ও প্রয়োজনীয় সহায়তার সুযোগ বাড়াতে হবে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন এবং সরকারের সমন্বিত উদ্যোগই পারে শিশুদের জন্য আরও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে।”