গবেষকদের মতে, মোট ৩০০ জন আক্রান্ত শিশুর তথ্য বিশ্লেষণ করে এই চিত্র পাওয়া গেছে। এর বিপরীতে মাত্র ৩২ জন বা ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ শিশু পূর্বে সরাসরি কোনো হাম রোগীর সংস্পর্শে এসে আক্রান্ত হওয়ার তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।

চট্টগ্রামে হামে আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, আক্রান্ত শিশুদের ৫৯ দশমিক ৪ শতাংশ শিশু অন্য কোনো রোগের চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল, ক্লিনিক বা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে যাওয়ার পর এই ভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছে।

গবেষকদের মতে, মোট ৩০০ জন আক্রান্ত শিশুর তথ্য বিশ্লেষণ করে এই চিত্র পাওয়া গেছে। এর বিপরীতে মাত্র ৩২ জন বা ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ শিশু পূর্বে সরাসরি কোনো হাম রোগীর সংস্পর্শে এসে আক্রান্ত হওয়ার তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। এছাড়া আক্রান্ত শিশুদের ৮৬ দশমিক ৭ শতাংশের শরীরে হামের সঙ্গে অন্তত একটি জটিলতা দেখা গেছে, যার মধ্যে নিউমোনিয়া ছিল সবচেয়ে বেশি।

সম্প্রতি দক্ষিণাঞ্চলের হাসপাতালে ভর্তি হাম আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে পরিচালিত এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, তীব্র অপুষ্টিতে থাকা শিশুদের গুরুতর জটিল হাম হওয়ার ঝুঁকি অন্যান্য শিশুদের তুলনায় প্রায় ২৪ গুণ বেশি।

‘দক্ষিণাঞ্চলীয় বাংলাদেশে ২০২৬ সালের হাম প্রাদুর্ভাব: রোগতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য, রোগের ক্লিনিক্যাল বৈশিষ্ট্য, জিনগত বিশ্লেষণ এবং মা ও শিশুর অ্যান্টিবডি পরিস্থিতি’ শীর্ষক গবেষণাটি করেছে আসপেরিয়া হেলথ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন (এআরএফ)। গবেষণায় সহযোগিতা করেছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এবং চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের শিশু গবেষণা দল। আর্থিক সহায়তা দিয়েছে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড।

‘মিজলস আউটব্রেক ২০২৬ ইন সাউদার্ন বাংলাদেশ: এপিডেমিওলজিক্যাল প্রোফাইল, ক্লিনিক্যাল ক্যারেক্টারিস্টিকস, জেনেটিক অ্যানালাইসিস উইথ মেটার্নাল অ্যান্ড চাইল্ড অ্যান্টিবডি স্ট্যাটাস’ শীর্ষক গবেষণাটির ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠান বুধবার (১৬ সেপ্টম্বর) দুপুর ১২ টায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের কনফারেন্স হলে অনুষ্ঠিত হয়।

গবেষণার প্রধান গবেষক চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. কামরুন নাহার বলেন, ‘হাম অত্যন্ত সংক্রামক রোগ। ফলে হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আক্রান্ত শিশু শনাক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাকে আলাদা করা, পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল নিশ্চিত করা এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

গবেষণায় আক্রান্ত শিশুদের প্রায় ৪৬ শতাংশের বয়স ৯ মাসের কম পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে ২৩ জনের বয়স ছিল ৬ মাসেরও কম। অর্থাৎ উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু নিয়মিত টিকা নেওয়ার বয়সে পৌঁছানোর আগেই হাম আক্রান্ত হয়েছে।

টিকা না নেওয়ার বিভিন্ন কারণও উঠে এসেছে গবেষণায়। প্রায় ৫২ শতাংশ শিশুর ক্ষেত্রে অভিভাবকেরা টিকা দেওয়ার নির্ধারিত সময় জানতেন না বা সময়টি ভুলে গিয়েছিলেন। ৩০ শতাংশ শিশুর টিকা দেওয়ার সময় অসুস্থতা ছিল। ৮ শতাংশ ক্ষেত্রে মা অসুস্থ থাকায় টিকা দেওয়া হয়নি। একইসংখ্যক অভিভাবক টিকা নিয়ে ভয় পাওয়ার কথা জানিয়েছেন। আর ৪ শতাংশ শিশুর টিকা কার্ড হারিয়ে যাওয়ায় টিকা নেওয়া হয়নি।

আক্রান্ত শিশুদের ৭৫ দশমিক ৫ শতাংশ গ্রাম বা প্রত্যন্ত এলাকার এবং ৬৪ দশমিক ৮ শতাংশ নিম্ন আর্থসামাজিক পরিবারের। ৫১ শিশুর ক্ষেত্রে তীব্র অপুষ্টি পাওয়া গেছে। এছাড়া ৩৭ শিশু জন্মের পর প্রথম ছয় মাস একচেটিয়া বুকের দুধ পায়নি।

গবেষণায় ১৭টি নমুনার পূর্ণাঙ্গ জিনগত বিশ্লেষণ করা হয়। এর মধ্যে পাঁচটি নমুনা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ, দুটি চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল, পাঁচটি কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ এবং পাঁচটি ফেনী জেনারেল হাসপাতাল থেকে নেওয়া হয়। সব ১৭টি নমুনাতেই হামের বি৩ ধরনের ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে।

গবেষকেরা জানিয়েছেন, বি-৩ কোনো নতুন ধরনের বা অজানা ভাইরাস নয়। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আগে থেকেই এ ধরনের হামের ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। এবারের প্রাদুর্ভাবের শুরুতে প্রচলিত টিকার বিরুদ্ধে প্রতিরোধী কোনো নতুন ভাইরাস এর পেছনে রয়েছে কি না, সে প্রশ্ন ছিল। তবে জিনগত বিশ্লেষণে নতুন কোনো ভাইরাসের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। গবেষণায় টিকাদানের ঘাটতিই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে সামনে এসেছে।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ডা. মোহাম্মদ মুসা মিয়া বলেন, ‘হামের প্রাদুর্ভাবের শুরুতে নতুন বা প্রচলিত টিকার বিরুদ্ধে প্রতিরোধী কোনো ভাইরাসের আশঙ্কা করা হয়েছিল। তবে গবেষণায় নতুন ভাইরাসের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। হাম নিয়ন্ত্রণে তাই টিকাদানের আওতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘সাধারণ ওয়ার্ডে হাম রোগীদের রাখলে অন্য রোগীদের মধ্যেও সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হয়। চট্টগ্রামে হাম রোগীদের জন্য পৃথক হাসপাতাল অথবা অন্তত ১০০ শয্যার একটি নির্দিষ্ট ইউনিট প্রয়োজন।’

গবেষণায় ১৭০ শিশুর মধ্যে বিভিন্ন জটিলতা পাওয়া গেছে। তাদের ৫৬ দশমিক ১ শতাংশের নিউমোনিয়া এবং ১৯ শতাংশের ডায়রিয়া ছিল। চিকিৎসাধীন অবস্থায় সাত শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যা গবেষণার মোট অংশগ্রহণকারীর ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। মৃত সব শিশুই টিকাবিহীন, এক বছরের কম বয়সী এবং তীব্র নিউমোনিয়া ও অপুষ্টিতে ভুগছিল।

গবেষণায় টিকা নেওয়া শিশুদের মধ্যে কোনো মৃত্যুর ঘটনা পাওয়া যায়নি। তবে গবেষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কিছু শিশুর টিকাদানের তথ্য মায়ের দেওয়া তথ্যের ওপর নির্ভর করায় এ ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

ভিটামিন ‘এ’ গ্রহণের বিষয়েও গবেষণায় পার্থক্য পাওয়া গেছে। যেসব শিশু ভিটামিন ‘এ’ পায়নি, তাদের ৬০ শতাংশের গুরুতর জটিল হাম ছিল। তবে গবেষকেরা সতর্ক করেছেন, এই তথ্য দিয়ে ভিটামিন ‘এ’ না পাওয়াই সরাসরি গুরুতর হাম হওয়ার কারণ—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।

গবেষণায় মা ও শিশুর হাম ও রুবেলার অ্যান্টিবডি সম্পর্কেও তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে ব্যবহৃত পরীক্ষার মাধ্যমে অ্যান্টিবডির সুনির্দিষ্ট মাত্রা নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। এ জন্য ভবিষ্যতে পরিমাণগত পরীক্ষা প্রয়োজন বলে গবেষকেরা জানিয়েছেন।

ডা. কামরুন নাহার বলেন, ‘কিছু শিশু প্রাথমিক অসুস্থতা থেকে সুস্থ হওয়ার কয়েক সপ্তাহ পর আবার অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ফিরে এসেছে। তাদের পরবর্তী সময়ে সংক্রমণ ও নিউমোনিয়া দেখা গেছে। হামের পর শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতায় দীর্ঘমেয়াদি কী ধরনের প্রভাব পড়ে, তা জানতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।’

চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. শেখ ফজলে রাব্বি বলেন, ‘টিকাদানের আওতা বাড়াতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিশুদের টিকা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে প্রাদুর্ভাব চলমান থাকায় শুধু টিকাদান যথেষ্ট নয়; আক্রান্তদের আলাদা রাখা ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘ভ্যাকসিনেশনের কোনো বিকল্প নেই। পাশাপাশি আইসোলেশন নিশ্চিত করতে হবে। গত কয়েক বছরে নিয়মিত টিকাদান ও ভিটামিন এ কর্মসূচিতে যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, সেটিও আমাদের বিবেচনায় নিতে হবে।’

তিনি জানান, ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের জন্য হাম টিকাদান কর্মসূচি নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে ৬ মাস বয়সী শিশুদের অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি এখনও সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘হাম নিয়ন্ত্রণে টিকাদান ও আক্রান্তদের আলাদা রাখা—দুই বিষয়কেই গুরুত্ব দিতে হবে। ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের টিকাদানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আক্রান্ত শিশুদের জন্য পৃথক আইসোলেশন হাসপাতালের বিষয়টিও বিবেচনা করা প্রয়োজন।’

গবেষণায় হাম প্রতিরোধে নিয়মিত টিকাদানের আওতা ৯৫ শতাংশের বেশি করা, বাদ পড়া শিশুদের বিশেষ টিকাদান কর্মসূচির আওতায় আনা, গ্রাম ও সুবিধাবঞ্চিত এলাকায় বাড়ি বাড়ি টিকাদান এবং টিকাদান কর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের সুপারিশ করা হয়েছে।

গবেষকেরা আরও বলেছেন, চিকিৎসাগত কোনো নির্দিষ্ট বাধা না থাকলে সামান্য সর্দি-কাশির কারণে টিকা অযথা পিছিয়ে দেওয়া উচিত নয়। একইসঙ্গে ৬ মাসের কম বয়সী শিশুদের সুরক্ষা, মায়েদের টিকাদানের ইতিহাস এবং মাতৃ অ্যান্টিবডি নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।

গবেষণাটির সীমাবদ্ধতা হিসেবে গবেষকেরা জানিয়েছেন, এটি হাসপাতালভিত্তিক হওয়ায় তুলনামূলক মৃদু উপসর্গের রোগীরা এতে কম প্রতিনিধিত্ব করতে পারে। আবার পর্যবেক্ষণভিত্তিক গবেষণা হওয়ায় কোনো একটি কারণ সরাসরি গুরুতর হাম সৃষ্টি করেছে—এমন কারণ-ফল সম্পর্ক নিশ্চিত করা যায় না।

এআরএফের চেয়ারম্যান গোলাম বাকী মাসুদ বলেন, ‘গবেষণায় রোগতাত্ত্বিক তথ্য, রোগের ক্লিনিক্যাল বৈশিষ্ট্য, মা ও শিশুর অ্যান্টিবডি এবং ভাইরাসের জিনগত বিশ্লেষণ একসঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে।’ গবেষণার ফলাফলকে শুধু বৈজ্ঞানিক প্রতিবেদনে সীমাবদ্ধ না রেখে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় বাস্তব পদক্ষেপে রূপ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।