লেবাননে প্রতি পাঁচটি পরিবারের প্রায় চারটিই বর্তমানে নিত্যপ্রয়োজনীয় মৌলিক চাহিদা পূরণে হিমশিম খাচ্ছে। সংঘাতের কারণে দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট আরও তীব্র হওয়ায় দেশটির শিশুরা ক্রমেই না খেয়ে থাকছে, স্কুলে যেতে পারছে না এবং অনেক শিশুকে কাজে নামতে হচ্ছে। এমন অবস্থায় লেবাননে প্রতি পাঁচ শিশুর একজন ক্ষুধার্ত অবস্থায় ঘুমায়। এর পাশাপাশি আনুমানিক ৭ লাখ ৭০ হাজার শিশু ও তরুণ গভীর মানসিক সংকটে ভুগছে।

বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে বলে সংবাদ প্রকাশ করেছে ইউএন নিউজ।

ছবি : ইউনিসেফ

ছবি : ইউনিসেফ

ইউনিসেফ-কে চার সন্তানের জনক বলেন, আমি আমার সন্তানদের জন্য কাপড় কিনতে চেয়েছিলাম, কিন্তু পারিনি। তাদের স্কুলে ভর্তি করাতে চেয়েছিলাম, সেটাও সামর্থ্যের বাইরে ছিল।

বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত এক সতর্কবার্তায় ইউনিসেফ জানায়, লেবাননের অন্তত প্রতি পাঁচটি পরিবারের একটিতে শিশুরা ক্ষুধার্ত অবস্থায় ঘুমাতে যায়। প্রায় একই সংখ্যক পরিবারের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপদ পানীয় জল নেই।

ইউনিসেফ লেবাননের প্রতিনিধি মারকোলুইজি কোরসি বলেন, লেবাননের শিশু ও তরুণদের এমন এক বোঝা বহন করতে হচ্ছে, যা কোনো শিশুর বহন করার কথা নয়। তিনি জানান, আনুমানিক ৭ লাখ ৭০ হাজার শিশু ও তরুণ গভীর মানসিক সংকটে ভুগছে।

মারকোলুইজি কোরসি সতর্ক করে বলেন, জরুরি ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নেওয়া না হলে এসব চাপ শিশুদের জীবনকে বহু বছর ধরে প্রভাবিত করবে।

ইউনিসেফ জানিয়েছে, লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে ১৭ এপ্রিলের যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রায় ছয় মাস পার হলেও দক্ষিণ লেবাননে বিমান হামলা ও বাড়িঘর ধ্বংসের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। লেবাননভিত্তিক হিজবুল্লাহ যোদ্ধা ও ইসরায়েলি বাহিনীর মধ্যে সংঘাত বন্ধের লক্ষ্যে ওই যুদ্ধবিরতি করা হয়েছিল।

সংঘাত তীব্র হওয়ার পর কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হলেও তাদের মধ্যে প্রায় ৩ লাখ ৩০ হাজার মানুষ এখনো বাড়ি ফিরতে পারেনি। এর প্রধান কারণ দক্ষিণ লেবাননে অব্যাহত হামলা ও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ওই অঞ্চলের একটি অংশ এখনো ইসরায়েলের দখলে রয়েছে।

জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয় দপ্তর ওসিএইচএ জানিয়েছে, দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন এলাকায় এখনো বিমান হামলা, গোলাবর্ষণ, বাড়িঘর ধ্বংস এবং সামরিক তৎপরতা চলছে। মানবিক সহায়তা পৌঁছানোও সীমিত হয়ে পড়েছে। ফলে নিরাপদ ও টেকসইভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষদের ঘরে ফেরার পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।

ইউনিসেফের সর্বশেষ An Enduring Nightmare প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় প্রতি তিনটি পরিবারের একটি জানিয়েছে, অর্থের অভাবে তাদের সন্তান প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিতে পারেনি।

এছাড়া, ১৪ শতাংশ পরিবার জানিয়েছে, অন্তত একটি শিশু কাজে যুক্ত হয়েছে; ২০২৫ সালের জানুয়ারির তুলনায় যা দ্বিগুণেরও বেশি।

সংঘাতে শিশুদের ওপর প্রাণঘাতী প্রভাবও পড়েছে। ২ মার্চ ২০২৬ থেকে অন্তত ২৬১ শিশু নিহত এবং এক হাজার ৫৬ শিশু আহত হয়েছে। অর্থাৎ ছয় মাসে গড়ে প্রতিদিন প্রায় সাতটি শিশু নিহত বা আহত হয়েছে। আহত শিশুদের আনুমানিক ১২ শতাংশ এখন প্রতিবন্ধিতা নিয়ে জীবনযাপন করছে, যা সংঘাতের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবকে তুলে ধরছে।

শিক্ষার খরচ জোগাতে পারছে না পরিবার

লেবাননের শিক্ষাব্যবস্থাও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইউনিসেফ জানিয়েছে, ৪৩৬টি স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে, যার ফলে প্রায় ১ লাখ শিশু শ্রেণিকক্ষে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এ ছাড়া ৮৬ জন শিক্ষক নিহত বা আহত হয়েছেন।
অর্থনৈতিক সংকটের কারণে পরিবারগুলো শিক্ষা খাতে ব্যয় কমাতে বাধ্য হচ্ছে। ৪৬ শতাংশ পরিবার জানিয়েছে, তারা শিক্ষা ব্যয় কমিয়েছে, আর ১৭ শতাংশ জানিয়েছে, তাদের সন্তান স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে।

যারা এখনো পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে, তাদের মধ্যেও ২৯ শতাংশ প্রত্যাশিতভাবে শিখতে পারছে না। এর পেছনে মনোযোগের সমস্যা ও মানসিক চাপ বড় কারণ বলে জানিয়েছে ইউনিসেফ।

বিজ্ঞাপন

শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য

শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও সংকটের ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে। গত ছয় মাসে আনুমানিক ৭ লাখ ৭০ হাজার শিশু মানসিক সংকটে পড়েছে। অর্ধেকের বেশি পরিবার জানিয়েছে, তাদের সন্তানদের মানসিক সুস্থতার অবনতি হয়েছে। ৬৩ শতাংশ পরিবার বলেছে, তাদের সন্তান উদ্বেগ বা নার্ভাসনেসে ভুগছে।

বিজ্ঞাপন

তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। এ বছরের শুরুতে ইউনিসেফের আরেকটি মূল্যায়নে দেখা যায়, ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সিদের মাত্র ২২ শতাংশ স্কুল বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে। মূল কারণ হিসেবে অর্থনৈতিক সংকটকে চিহ্নিত করা হয়। ওই জরিপের সময় ৬৭ শতাংশ তরুণ বেকার ছিল।

এক জননী ইউনিসেফকে বলেন, আমরা বৈরুতের দক্ষিণ উপকণ্ঠ থেকে পালিয়ে এসেছিলাম। বিস্ফোরণের শব্দে আমার ছেলে এতটাই আতঙ্কিত হয়েছিল যে, শব্দ করে এমন একটি সুন্দর রঙিন খেলনা এনে দেওয়ার পরও সে ভয় পেয়ে অনেক কেঁদেছিল।

২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে লেবাননে মানবিক সহায়তা বাড়িয়েছে ইউনিসেফ। সংস্থাটি আহত শিশুদের চিকিৎসা, আশ্রয়কেন্দ্র ও চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহ এবং বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোকে সহায়তা করছে। পাশাপাশি শিশুদের জন্য জাতীয় স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবা ব্যবস্থা সচল রাখার কাজও করছে সংস্থাটি।

ইউনিসেফের প্রতিনিধি কোরসি বলেন, জরুরি ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নেওয়া না হলে একটি পুরো প্রজন্ম এই সংকটের ক্ষত নিয়ে প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে প্রবেশের ঝুঁকিতে রয়েছে।

ইউনিসেফ বলছে, বর্তমান সংঘাত ২০২৩–২০২৪ সালের লড়াই এবং ২০১৯ সালের শেষ দিক থেকে চলতে থাকা সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটের ক্ষতি ও দুর্ভোগ আরও বাড়িয়েছে। বর্তমানে বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর ৮৩ শতাংশ জানে না তারা কবে বাড়ি ফিরতে পারবে।

সংস্থাটি বলেছে, শিশুদের এখনই সুরক্ষা দেওয়া এবং তাদের স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার সুযোগ নিশ্চিত করাই লেবাননের পুনরুদ্ধারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।