তিন দিনব্যাপী উন্নয়ন মেলা

0
13

উন্নয়ন মেলাসময়েপাতাঃ উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে সবার সহযোগিতা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘সবার সম্মিলিত উদ্যোগ থাকলে বাংলাদেশকে আমরা দারিদ্র্যমুক্ত করতে পারব। নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারব, মর্যাদা নিয়ে চলতে পারব। ’

গতকাল গণভবনে ভিডিও কনফারেন্সের  মাধ্যমে দেশের ৬৪ জেলায় একযোগে উন্নয়ন মেলার উদ্বোধনকালে তিনি এসব কথা বলেন। এ উন্নয়ন মেলা চলবে আগামীকাল পর্যন্ত। প্রধানমন্ত্রী মেলার উদ্বোধন ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে সব জেলা ও উপজেলায় বেলুন ও পায়রা উড়িয়ে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক এবং প্রশাসনের কর্মকর্তারা মেলার উদ্বোধন করেন। এ মেলার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে—দেশের চলমান উন্নয়ন সাফল্যকে জনগণের সামনে তুলে ধরে সরকারের উন্নয়ন কাজের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ত করা। পাশাপাশি সরকারের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা ও সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) অর্জনে সরকারের সাফল্য প্রচার এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করা। গণভবন থেকে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে সরাসরি যুক্ত ছিল টাঙ্গাইল, বরিশাল, খুলনা ও গোপালগঞ্জ জেলা। মেলার কার্যক্রম উদ্বোধনের পর প্রধানমন্ত্রী এসব জেলার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা আছেন সর্বস্তরে। সংসদ সদস্য থেকে একেবারে ইউনিয়ন পরিষদের ওয়ার্ড মেম্বার, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, প্রশাসনে সম্পৃক্ত ব্যক্তিবর্গ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা, সবার একটি সমন্বিত উদ্যোগ থাকলে দেশকে দ্রুত দারিদ্র্যমুক্ত করতে পারব। ’ তিনি বলেন, ‘সবার সহযোগিতা চাই এজন্য যে, দেশকে আমরা যে উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি, এর গতি যেন থেমে না যায়। এই উন্নয়নের গতিধারা যেন সবসময় অব্যাহত থাকে। যেন দেশকে সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তুলতে পারি। ’ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে জনগণকে সম্পৃক্ত করার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা ৬৪ জেলা ও ৪৯০টি উপজেলায় উন্নয়ন মেলা করছি। বিভিন্ন দেশে আমাদের যেসব দূতাবাস রয়েছে তারাও সুবিধামতো সময়ে এ মেলার আয়োজন করছে, যেন বিদেশিরাও জানতে পারে আমরা উন্নয়নের জন্য কী কী কাজ করছি। মেলায় আমরা সরকারি সেবাগুলোর তথ্যচিত্র দেখাচ্ছি। এভাবে মানুষ তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হবে। ’ তিনি বলেন, ‘মুখে হয়তো আমরা এমডিজি, এসডিজি বলি। কিন্তু এ থেকে দেশের মানুষ কী কী সুবিধা পাবে, তা এই মেলার মধ্য দিয়ে জানা যাবে। ’ তিনি বলেন, ‘আমরা ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলব। কোন অঞ্চলে কী উৎপাদিত হয়, তার ভিত্তিতে কিভাবে শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা যায়, তা নিয়ে ভাবছি আমরা। আমাদের অর্থনৈতিক অঞ্চলে যেন আরও বিনিয়োগ আসে, সে পদক্ষেপ নিয়েছি। আরও কী কী হলে ভালো হয়, সে মতও নিচ্ছি। ’ উন্নয়ন মেলায় জনপ্রতিনিধি, কৃষক, শ্রমিক, সবাই থাকবে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, উন্নয়নের তথ্য ও ভবিষ্যতে কী সম্ভাবনা রয়েছে, তা জানার ক্ষেত্রে এটি সুবর্ণ সুযোগ। তিনি বলেন, জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসবাদ বিরোধী যে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি, আমি মনে করি এজন্য প্রত্যেকের সামাজিক চেতনা গড়ে তোলা উচিত। দেশকে পিছিয়ে দেওয়ার দিন শেষ হয়েছে। হত্যা-ক্যুর রাজনীতি বিদায় নিয়েছে। এখন আমরা উন্নয়নের মহাসড়কে। বাংলাদেশ এখন বিশ্বসভায় উন্নয়নের রোল মডেল বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

অনুষ্ঠানে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের একটি ভিডিওচিত্রও প্রদর্শিত হয়। উন্নয়ন মেলায় জেলা-উপজেলা পর্যায়ের বিভিন্ন সরকারি দফতর, সংস্থা, ব্যাংক, বীমা ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি-বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা অংশগ্রহণ করছে। মেলায় প্রতিদিন সভা, সেমিনার, স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র প্রদর্শন, ছবি ও পোস্টার প্রদর্শন এবং দেশাত্মবোধক সাংস্কৃতিক পরিবেশনা থাকবে। মেলায় একটি বাড়ি একটি খামার, কমিউনিটি ক্লিনিক, নারীর ক্ষমতায়ন, সবার জন্য বাসস্থান, শিক্ষা সহায়তা, ডিজিটাল বাংলাদেশ, পরিবেশ সুরক্ষা, বিনিয়োগ বিকাশ, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, ঘরে ঘরে বিদ্যুৎসহ সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রম তুলে ধরা হবে।উন্নয়ন মেলা 2

এক ছাতার নিচে সব উন্নয়ন চিত্র : এক ছাতার নিচে সব ধরনের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের চিত্র তুলে ধরতে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী উন্নয়ন মেলা-২০১৭। পুরো শিল্পকলা একাডেমি জুড়ে শুধুই উন্নয়নের চিত্র। বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, মহাসড়কের উন্নয়ন, প্রাথমিক শিক্ষার অর্জন, দারিদ্র্য বিমোচন, ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, পরিবেশ উন্নয়ন, মৎস্য, কৃষি উন্নয়ন, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনসহ সব ধরনের উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণের এক ছাতার নিচে। শুধু তা-ই নয়, প্রদর্শিত হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসসহ উন্নয়নের বিভিন্ন প্রামাণ্য চিত্রও। মহাজোট সরকারের উন্নয়নের চিত্র দেখাতে দেশের প্রতিটি জেলা-উপজেলায় এ মেলার আয়োজন করেছে স্থানীয় প্রশাসন। মেলায় সরকারের নেওয়া বিভিন্ন ধরনের উন্নয়ন প্রকল্পের চিত্র তুলে ধরা হচ্ছে। ঢাকা জেলা প্রশাসন রাজধানীর শিল্পকলা একাডেমিতে এ মেলার আয়োজন করেছে। গতকাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান এ মেলার উদ্বোধন করেন। এতে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন বলেন, চীনের দুঃখ যেমন হোয়াংহো, তেমন ঢাকার দুঃখ হচ্ছে যানজট। এ জন্য সব বড় রাজনৈতিক দলকে সরকারি ছুটির দিনে ঢাকায় সভা-সমাবেশ করার আহ্বান জানান তিনি। বিকালে অর্থ বিভাগের সিনিয়র সচিব মাহবুব আহমেদ মেলা পরিদর্শন করেন। এতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন ঢাকা জেলার প্রশাসক মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন। ‘শেখ হাসিনার দর্শন, সব মানুষের উন্নয়ন’ এই মূলমন্ত্রকে ধারণ করে ২০২১ সালের মধ্যে ‘ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ’ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে ‘উন্নত বাংলাদেশ’ গঠনে সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রম জনসাধারণের সামনে এ মেলায় উপস্থাপন করা হচ্ছে। এদিকে গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে মেলার উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর আগে গতকাল সকালে উন্নয়ন মেলা উপলক্ষে অফিসার্স ক্লাব থেকে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি পর্যন্ত র‌্যালির আয়োজন করা হয়। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ র‌্যালিতে অংশগ্রহণ করেন। মেলায় দেশের সব মন্ত্রণালয়, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমান বাহিনী, পুলিশ, আনসার, বিভাগ-অধিদফতর পৃথক পৃথক স্টল স্থাপন করেছে। সব সরকারি, আধা-সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার পক্ষ থেকে মেলায় আগত দর্শনার্থীদের সামনে তাদের নিজ নিজ সংস্থার উন্নয়ন কার্যক্রম তুলে ধরা হচ্ছে। তাদের পক্ষ থেকে মেলার দর্শনার্থীদের তাত্ক্ষণিক সেবাও প্রদান করা হচ্ছে।   এ মেলার মাধ্যমে গত ১২ বছরের উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরা হচ্ছে। বিশেষ করে ২০০৮ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত সময়ে যেসব উন্নয়ন কর্মকাণ্ড শুরু হয়েছে এবং যেসব উন্নয়ন প্রকল্প সমাপ্ত হয়েছে সেগুলো বিভিন্নভাবে তুলে ধরা হচ্ছে মেলায়। এ ছাড়া সরকারের নেওয়া মেগা প্রকল্প মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র, এলএনজি টার্মিনাল, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উেক্ষপণ প্রকল্পের অগ্রগতি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে মেলার মাধ্যমে। এ জন্য বিভিন্ন ধরনের ব্রশিউর, বুকলেট, লিফলেটও প্রকাশ করা হয়েছে। তিন দিনব্যাপী মেলায় থাকছে আলোচনা সভা। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমেও দেশের মুক্তিযুদ্ধ ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের নানা দিক তুলে ধরা হচ্ছে। দেশবরেণ্য শিল্পী-কলাকুশলীদের পরিবেশনায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান মেলা প্রাঙ্গণ থেকে সরাসরি প্রচার করা হচ্ছে। এ ছাড়া মেলা উপলক্ষে আয়োজন করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক কুইজ, আলোচনা, বিতর্ক ও রচনা প্রতিযোগিতা, যার মাধ্যমে জনসাধারণের কাছে উন্নয়নের বিভিন্ন তথ্য পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।   জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন অনুযায়ী ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলা গড়ে তোলার জন্য যে ১০টি বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। সেগুলোও এ মেলার মাধ্যমে তুলে ধরা হচ্ছে। ১০টি বিশেষ উদ্যোগ হচ্ছে—একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প, আশ্রয়ণ প্রকল্প, ডিজিটাল বাংলাদেশ, শিক্ষা সহায়তা কর্মসূচি, নারীর ক্ষমতায়ন কর্মসূচি, সবার জন্য বিদ্যুৎ, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, কমিউনিটি ক্লিনিক ও মানসিক স্বাস্থ্য, বিনিয়োগ উন্নয়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণ। মেলায় এ বিষয়গুলোর ওপর বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজনও করা হয়েছে। গতকাল শিল্পকলা একাডেমির মেলা প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা গেছে বিকাল থেকে রাত পর্যন্ত দর্শনার্থীর ঢল। মেলা উপলক্ষে শিল্পকলা একাডেমির চারপাশ, মৎস্য ভবন, কাকরাইলসহ বিভিন্ন এলাকায় উন্নয়ন প্রকল্পের সচিত্র ব্যানার, সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড টানানো হয়েছে।