মানিকগঞ্জে ৫০ হাজার কুকুরের কাছে অসহায় মানুষ গরু ছাগল

0
80

মানিকগঞ্জে ভয়ানক কুকুরদের কাছে মানুষ অসহায় হয়ে পড়েছে। শহর, বন্দর, হাট-বাজারে, প্রত্যন্ত গ্রাম, কৃষিমাঠ কিংবা চরাঞ্চলে দল বেঁধে ঘুরে বেড়ায় কুকুরের দল। স্কুলগামী ছোট ছেলেমেয়ে, পথচারী, কৃষক -শ্রমিক, সাধারণ মানুষ, গরু-ছাগল কেউ রক্ষা পাচ্ছে না কুকুরের আক্রমণ থেকে। জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের হিসাবে জেলায় বর্তমানে প্রায় ৫০ হাজার কুকুর রয়েছে। বেসরকারি হিসাবে সংখ্যা আরো বেশি। এসব কুকুরের ৯৯.৯৯ শতাংশই বেওয়ারিশ, যার কোনো মালিক নেই। বেওয়ারিশ এই কুকুরেরা সদা স্বাধীনভাবে বিচরণ করলেও জেলার ১৫ লাখ মানুষ কিন্তু স্বাধীন নয়, তারা জিম্মি এই কুকুরদের কাছে। এদের নতুন প্রজন্ম এ বছর বৃৃদ্ধি পাবে প্রায় ৫০ হাজার।মানিকগঞ্জমানিকগঞ্জ পৌরমেয়র গাজী কামরুল হুদা সেলিম বলেন, হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা থাকার কারণে আমাদের পক্ষে আর কুকুর নিধন করা সম্ভব নয়।
জানা গেছে, ২০১৪ সালে ‘অভায়ারণ্য বাংলাদেশ এনিমেল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন’-এর পক্ষ থেকে কুকুর নিধন বন্ধে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট ডিভিশন কুকুর নিধন নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। কুকুর নিধন কার্যক্রম বন্ধ থাকায় দিন দিন বেড়ে চলছে বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (মহাখালী, ঢাকা ) ডা: কামরুল ইসলাম বলেন, ২০১৫ সালে মানিকগঞ্জ জেলায় মোট কুকুরের সংখ্যা ছিল ২৭ হাজার ৩০০টি। ‘মাক্স ডক ভ্যাকসিন’ প্রকল্পের আওতায় মানিকগঞ্জ জেলায় ওই বছরের অক্টোবরের ২২ তারিখ থেকে ২৬ তারিখ পর্যন্ত ২০২৭৭৭টি কুকুরকে দুই বছর মেয়াদি ভ্যাকসিন দেয়া হয়।
ভ্যাকসিন দেয়া কুকুরে কামড়ালেও জলাতঙ্ক রোগ হবে না। তার হিসাব মতে ছয় হাজার ৫২৩টি কুকুর ছিল ভ্যাকসিনের আওতার বাইরে। কিন্তু খোদ স্বাস্থ্য বিভাগের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ওই সময় জেলার মোট কুকুরের অর্ধেক কুকুরকেও ভ্যাকসিন দেয়া সম্ভব হয়নি। ওই প্রকল্পের টাকাগুলোই পানিতে গেছে। কারণ যে কুকুরগুলোকে ভ্যাকসিন দেয়া হয়েছে, সেগুলোকেও স্থায়ী কোনো চিহ্ন দেয়া হয়নি। এ কারণে কয়েক দিন পরেই আর বোঝার উপায় ছিল না যে, কোন কুকুরটিকে আসলে ভ্যাকসিন দেয়া হয়েছে।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা: ফরহাদুল আলম বলেন, জেলায় বর্তমানে প্রায় ৫০হাজার কুকুর রয়েছে। জেলায় এক হাজার ৬৬৮টি গ্রাম রয়েছে। প্রতিটি গ্রামে গড়ে কমপক্ষে ৩০টি করে কুকুর রয়েছে। এ হিসাবে শুধু গ্রামেই কুকুরের সংখ্যা দাঁড়ায় ৫০ হাজার ৪০টি। এ ছাড়াও জেলা শহর, হাট-ঘাট-বাজার, চরাঞ্চল ধরলে কুকুরের সংখ্যা আরো ১০ হাজার হবে বলে অনেকের ধারণা। সরকারিভাবে কুকুরের নির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান নেই। সরকারি হিসাবে গত এক বছর চার মাসে জেলায় কুকুর বৃদ্ধি পেয়েছে ২২ হাজার ৭০০টি। কুকুর বৃদ্ধির এ হার অব্যাহত থাকলে আগামী এক বছর পর জেলায় কুকুরের সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়ে যাবে বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করছেন।
জেলার মানুষ সর্বদা কুকুরের ভয়ে আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে। জেলায় গড়ে প্রতি দিন প্রায় ১৫০ জন কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত হচ্ছে। আক্রান্তদের সর্বোচ্চ ১৫ ভাগের ১ ভাগ মানুষ মানিকগঞ্জ সদর হাসপাতালে আসে ভ্যাকসিন নিতে। গত ২০১৪ সালে কুকুরের ভ্যাকসিন নিয়েছে দুই হাজার ৮৫০ জন আর অন্যান্য প্রাণীর ভ্যাকসিন নিয়েছে এক হাজার দুইজন, মোট তিন হাজার ৮৫২ জনের বিপরীতে সরকারি ভ্যাকসিন বরাদ্দ ছিল মাত্র ৫৫৬টি। ২০১৫ সালে কুকুরের ভ্যাকসিন নিয়েছে দুই হাজার ৯৫৭ জন আর অন্যান্য প্রাণীর ভ্যাকসিন নিয়েছে এক হাজার ১৮৪ জন, মোট চার হাজার ১৪১ জন কিন্তু সরকারি বরাদ্দ ছিল মাত্র এক হাজার ১৮টি ভ্যাকসিন। ২০১৬ সালে কুকুরের কামড়ের ভ্যাকসিন নিয়েছে তিন হাজার ১৪৪ জন আর অন্যান্য প্রাণীর কামড়ে আক্রান্ত হয়েছে এক হাজার ৬১৬ জন; কিন্তু সরকারি ভ্যাকসিন বরাদ্দ ছিল মাত্র ৯৯০টি। মানিকগঞ্জ সদর হাসপাতালে সরকারি ভ্যাকসিনের পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকার কারণে রোগীদের টাকা দিয়ে ভ্যাকসিন কিনে শুধু এখান থেকে পুশ করে দেয়া হয় বলে জানান, নার্সিং অফিসার আনিছুর রহমান ভূঁইয়া।
সরকারি ভ্যাকসিন না থাকা প্রসঙ্গে জেলা সিভিল সার্জন ডা: ইমরান আলী বলেন, গত মাসে আমি মাত্র ৫০টি সরকারি ভ্যাকসিন পেয়েছি অথচ চাহিদা ছিল ৫০০টি। আমরা সরকারের কাছে প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিন বারবার চাচ্ছি কিন্তু সবগুলো পাচ্ছি না।
বেপরোয়া কুকুরেরা দল বেঁধে ঘুরে বেড়ায় আর সুযোগ পেলেই কৃষি মাঠে বেঁধে রাখা ছাগল-ভেড়ার ওপর হায়েনাদের মতো ঝাপিয়ে পড়ে। কয়েক মূহূর্তেই জীবন্ত ছাগলটাকে খেয়ে ফেলে চলে যায়। অনেক সময় আক্রান্ত পশুকে বাঁচাতে গেলে উল্টো মানুষের ওপর আক্রমণ করে বসে ভয়ানক এ কুকুরের দল।
মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান মাওলানা মুহাম্মদ শামসুল ইসলাম জানান, কয়েক দিন আগে পুটাইল ইউনিয়নের কাফাটিয়া গ্রামের মানিকের মায়ের মাঠে বেঁধে রাখা ছাগল খেয়ে ফেলেছে কুকুরের দলে। তিনি আরো বলেন, হাসলি গ্রামের তোমছের আলীর বাড়ির কাছে রাস্তা দিয়ে মানুষ চলাচল কষ্টকর হয়ে পড়েছে কুকুরের ভয়ে। কুকুরের ভয়ে অনেক অভিভাবক শিশুদের একা স্কুলে যেতে দিচ্ছে না। এ অবস্থায় অনেক এলাকায় শুধু কুকুরের ভয়ে ছেলেমেয়েদের পড়ালেখা ব্যাহত হচ্ছে।
মানিকগঞ্জ সদর হাসপাতালের আর এম ও ডা: লুৎফর রহমান বলেন, এ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে হলে সরকারি ভ্যাকসিনের সরবরাহ বাড়াতে হবে, কুকুরকে ভ্যাকসিন দিতে হবে, কুকুরের জন্মনিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসক রাশিদা ফেরদৌস বলেন, আমর দ্রুতই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবো।