ঐতিহ্য হারাচ্ছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো অলিতে গলিতে গড়ে উঠেছে ব্যক্তি মালিকানাধীন স্কুল

0
21

সময়ের পাতা ডেস্কঃ শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড। এই শিক্ষা অর্জনের প্রথম স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান হচ্ছে প্রাথমিক
বিদ্যালয়। বাংলাদেশে ৬৩,৬০১ টি প্রাথমিক
বিদ্যালয়ে প্রায় ৩,২২,৭৬৬ জন শিক্ষক শিক্ষকতায় নিয়োজিত রয়েছেন। কিন্তু দুখের বিষয় হচ্ছে সরকারি যথেষ্ট সুযোগ সুবিধা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকলেও এই প্রতিষ্ঠানগুলো
নিজেদেরকে সেই ভাবে সাফল্যের সাথে মেলে
ধরতে পারছে না। যারফলে সারাদেশের অলিতে গলিতে গড়ে উঠেছে ব্যক্তি মালিকানাধীন শিশু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান
‘কিন্ডারগার্টেন’ বা কেজি স্কুল। শহরকেন্দ্রিক
শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে সারাদেশে ব্যাপকভাবে
কেজি স্কুলের প্রসার ঘটছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত চার থেকে পাঁচ বছর এ স্কুলগুলোর সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। প্রতি বছর লাখ লাখ শিশু এসব স্কুলে ভর্তি হচ্ছে। শিক্ষার গুনগত মান,বিগত বছরের সাফল্য ইত্যাদি বিবেচনা করে অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের এইসব কিন্ডারগার্টেনে ভর্তি করাচ্ছে। অন্যদিকে
হাতেগুনা কিছু সংখ্যক অভিভাবক তাদের
সন্তানদের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি
করালেও সেখানে তারা মানসম্মত ও
যোগোপযোগী শিক্ষার পাচ্ছে না। ফলে
প্রতিযোগিতামূলক ‘প্রাথমিক সমাপনী’ পরীক্ষার ফলাফলের ক্ষেত্রে এইসব কিন্ডারগার্টেনের জয়জয়কার।
আজ কালকার কেজি স্কুল গুলোতে ক্লাস ওয়ানে ১০/১২ টা বই পড়ানো হয়। অথচ শিশুর বয়স ও সমার্থ অনুযায়ী পড়ানো উচিত। অল্প বয়সে তার ব্রেইনের উপর এ চাপ অনেক সময় ক্ষতির ও কারন হয়ে দেখা দেয়। কিন্তু কেজি স্কুলগুলো লাগামহীন ভাবে চলছে। কোনো কোনো বেসরকারি প্রকাশকদের কাছ
থেকে উৎকোচ নিয়ে একশ্রেণীর স্কুল প্লে
গ্রুপের শিশুর ওপরও বইয়ের অত্যাচার চালায়। এসব প্রতিষ্ঠানে অনেক শিক্ষক আছেন যাদের শিক্ষক হওয়ার ন্যূনতম যোগ্যতা নেই। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণেরও নেই কোনো ব্যবস্থা। অনেক স্কুলের মালিক, তার স্ত্রী ও সন্তানরা মিলে স্কুল চালাচ্ছেন। অথচ আদায় করা হচ্ছে ইচ্ছা মতো ফি। যদিও শিক্ষার্থীরা মান সম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। শিক্ষকদের বেতন-ভাতাও দেয়া হয় নামমাত্র। এক কথায় রমরমা শিক্ষা বাণিজ্য চালাচ্ছে এসব প্রতিষ্ঠান।
এভাবে চলতে থাকলে আমাদের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো ধীরে ধীরে তাদের ঐতিহ্য হারিয়ে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। তাই
কর্তৃপক্ষের উচিত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে
যোগোপযোগী এবং মানসম্মত শিক্ষার ব্যবস্থা
গ্রহণ করে হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা।
এসব স্কুলের ওপর সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। কারণ এই স্কুলগুলো সরকারি নিবন্ধিত নয়। এদের মধ্যে রয়েছে ইংরেজি ও জাতীয় শিক্ষাক্রম অনুযায়ী পরিচালিত স্কুল। বেসরকারি স্কুলগুলো নিবন্ধনের জন্য ১৯৬২ সালে জারি করা একটি অধ্যাদেশ থাকলেও তার কোনো কার্যকারিতা নেই।
আর কিন্ডারগার্টেন স্কুল বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট
নীতিমালা না থাকায় এগুলো চলছে অনেকটা
স্বেচ্ছাচারীভাবে। বেতন হিসেবে ইচ্ছামতো টাকা
নিচ্ছে শিক্ষার্থীদের কাছে থেকে। এ ছাড়া শিক্ষক নিয়োগেও কোনো নীতিমালা নেই। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে কিন্ডারগার্টেনের নিবন্ধন না থাকায় ও এসব স্কুলের সঠিক সংখ্যা সম্পর্কে তথ্য না
থাকায় বছরের শুরুতে বিনামূল্যের বই বিতরণ নিয়ে বিপাকে পড়েছিল সরকার। ভোগান্তির শিকার হয়েছিল শিক্ষার্থীরা।
১৯৬২ সালের ৬ জুন ‘দি রেজিস্ট্রেশন অব প্রাইভেট স্কুল’স অর্ডিনেন্স, ১৯৬২’ অধ্যাদেশ জারি করা হয়। পরবর্তীতে এ অধ্যাদেশের কিছু কিছু ক্ষেত্রে ১৯৮৯, ১৯৯৯ এবং সর্বশেষ ২০০১ সালে সংশোধনী আনা হয়। অধ্যাদেশ অনুযায়ী দেশের সকল বেসরকারি স্কুলের নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। তবে বেশিরভাগ বেসরকারি স্কুলই নিবন্ধন ছাড়া শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। আর জাতীয় শিক্ষাক্রম অনুসরণ করা প্রায় শতভাগ কিন্ডারগার্টেন চলছে অনুমোদন ছাড়া। বেসরকারি স্কুল অধ্যাদেশের আওতায় সরকারের সংশ্লিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠান থেকে অনুমোদন নিয়ে চলছে কিছু ইংরেজি মাধ্যম স্কুল।
২০০১ সালে সর্বশেষ সংশোধিত ঐ অধ্যাদেশের ৩ নং ধারায় বলা হয়েছে, অধ্যাদেশের নিয়ম ব্যতিরেকে কোনো বেসরকারি স্কুল প্রতিষ্ঠা বা চলতে পারবে না।
বেসরকারি স্কুলগুলোর নিবন্ধন সংক্রান্ত নির্দেশনা দেয়া হয়েছে অধ্যাদেশের ৪ নং ধারায়। ৪ নং ধারার ১ ও ২ নং উপধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নিবন্ধন করতে চায় তবে তাকে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আবেদন করে নিবন্ধন ফি জমা দিতে হবে। এ
ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানে ভবন, শিক্ষকের যোগ্যতা, সংখ্যা ও বেতন বিবেচ্য বিষয় হবে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের বেতন স্কুলের সুবিধাদির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে এবং সরকারের নির্ধারিত বেতন সীমার মধ্যে থাকতে হবে। নিবন্ধন আগ্রহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড কর্তৃক অনুমোদিত শিক্ষাক্রম
অনুসরণ করতে হবে। শুধুমাত্র এনসিটিবি অনুমোদিত, প্রকাশিত ও মুদ্রিত বই-ই এসব স্কুলের পাঠ্যবই হিসেবে বিবেচিত হবে। তবে সামাজিকভাবে অবাঞ্ছিত কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদন দেয়া যাবে না বলে অধ্যাদেশে নির্দেশনা দেয়া রয়েছে। তবে
নিবন্ধনের পর যদি কোনো প্রতিষ্ঠান ঐ সকল শর্ত ভঙ্গ করে তবে তাদের নিবন্ধন সাময়িকভাবে স্থগিত অথবা বাতিল করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে অধ্যাদেশের
৬নং ধারায়। এমনকি অধ্যাদেশের লঙ্ঘন করলে জেল- জরিমানারও বিধান রয়েছে। ৯নং ধারায় বলা হয়েছে, যদি কেউ স্বপ্রণোদিত হয়ে এ অধ্যাদেশের বিরোধিতা বা লঙ্ঘন করে তবে তাকে সর্বোচ্চ এক বছরের জেল বা সর্বোচ্চ দশ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয়েই দ-িত করার বিধান রয়েছে।