নিমন্ত্রণ আর রক্ষা করা হলো না

0
71

সময়ের পাতা ডেস্ক: চলে গেলেন ওম পরী। বহুমাত্রিক চরিত্রে অসাধারণ এক অভিনেতার বিদায়।  মাত্র ৬৬ বছর বয়সে গতকাল তিনি না ফেরার দেশে চলে গেছেন। রয়ে গেছে সেলুলয়েডবন্দী তার অসংখ্য চলচ্চিত্র। এই চলে যাওয়াকে কেউ মেনে নিতে পারছেন না। কেউ কেউ আবেগ সামাল দিতে না পেরে নিজেকে শান্ত¡না দিয়ে বলছেন, তিনি সকলের মাঝে উপস্থিত থাকবেন তার সৃজনশীল অভিনয়ের মাধ্যমে বাস্তবোচিত হয়ে ওঠা চরিত্রগুলোর মধ্য দিয়ে। এটা শাশ্বত একটা বিষয়। অভিনেত্রী চম্পা বললেন, তার মতো একজন বহুমাত্রিক অভিনেতা আর কখনো বলিউড পাবে কিনা সন্দেহ আছে। সত্যজিৎ রায়ের ছেলে সন্দ্বীপ রায়ের টার্গেট চম্পার নায়ক ছিলেন ওম পুরী। এই ছবিটির চলচ্চিত্রায়নের সময় লোকেশনে আমিও উপস্থিত ছিলাম। টার্গেট ছবির অন্তঃদৃশ্য চিত্রায়িত হয়েছে কলকাতার ইন্দ্রপুরী ষ্টুডিওতে।

সেটা ১৯৯৪ সালের কথা। একদিন এফডিসিতে চম্পা আমাকে বললেন, তিনি আগামী তিন বা চার দিনের মধ্যে কলকাতা যাচ্ছেন সন্দ্বীপ রায়ের টার্গেট ছবিতে কাজ করতে। থাকবেন প্রায় ১৫ দিন। তার বিপরীতে নায়ক হলেন বলিউডের শক্তিমান অভিনেতা ওম পুরী। চম্পা বললেন, ‘চলুন আমার সঙ্গে। ওম পুরী ছাড়াও সেখানে আরও অনেককে পাবেন। লেখার অনেক উপকরণ পাবেন।’ একজন বিনোদন সাংবাদিক হিসেবে প্রস্তাবটি ছিল লোভনীয়। তাই তার কথায় এক কথায় রাজী হয়ে গেলাম।

চম্পা আমাকে একটা ঠিকানা দিলেন। নির্ধারিত দিনে কলকাতার হাজরা রোডে শানুদার বাড়িতে পৌঁছে জানতে পারলাম চম্পা কলকাতার বাইরে ছবিটির আউটডোর শুটিং করছেন। সেদিনই সন্ধ্যা নাগাদ কলকাতা ফিরে আসবেন।

এখানে শানু দা মানে শানু ব্যানার্জী ঢাকার নাট্যাঙ্গনে বেশ পরিচিত একটি নাম। নাটক জগতের কেউ কলকাতা গেলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই হাজরা রোড ল’ কলেজের পাশের এই বাড়িতে ওঠেন। তার বাড়ির পেছনেই মৃণালিনী নামে একটি লজ। সেখানেই উঠেছেন ওম পুরী। চম্পাও সেই লজে থাকেন। টার্গেট আর যেসব শিল্পী উঠেছেন তাদের মধ্যে পুনা ফিল্ম ইনস্টিট্যুটের শিক্ষক ড. মোহন আগাসে, দিল্লি টেলিভিশনের অভিনেতা মোহন গোখলে এবং দিল্লি থেকে আসা বাঙ্গালি অভিনেতা অজয় রায়। তিনি ব্যাংক অব ইন্ডিয়ায় চাকরী করেন। সে সুবাদেই তার সেখানে থাকা।

রাতে খাওয়ার টেবিলে সকলের সঙ্গে দেখা হলেও কথা হয়নি। কারণ আমাদের মধ্যে পরিচয় হয়নি। চম্পাও বিষয়টি মাথা নেননি। দীর্ঘদিনের বিনোদন সাংবাদিকতার সুবাদে চম্পাদের সঙ্গে যেভাবে সম্পর্ক গড়ে উঠেছে, চম্পা সেভাবেই ব্যাপারটা দেখছিলেন। এভাবে তিন দিন কেটে গেল। আমাদের তিন বেলাই দেখা হচ্ছে, অথচ কথা হচ্ছে না।

চতুর্থ দিন ওম পুরী নিজেই চম্পার কাছে জানতে চাইলেন, শুনলাম তোমাদের দেশ থেকে একজন সাংবাদিক এসেছে। তার সঙ্গে দেখাও হচ্ছে, কিন্তু আমরা কেউ কাউকে হায়-হ্যালো বলতে পারছি না কেন? চম্পা মাথায় হাত বললেন, সরি দাদা ভুল আমারই হয়েছে। আমি কারো সঙ্গেই পরিচয় করিয়ে দেইনি। চম্পা দ্রুতই আমাকে ডেকে নিলেন এবং এক এক করে সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। পরিচয় পর্ব শেষ হতেই ওম পুরী আমাকে বললেন, তুমি আমার সঙ্গে চলো ষ্টুডিওতে। আমি আজই তোমার সঙ্গে কথা বলব। তুমি এতোদূর যখন এসেছ তখন দেশে ফিরে গিয়ে নিশ্চয়ই কিছু লিখবে।

ইন্দ্রপুরী ষ্টুডিওতে পৌঁছে আমি ব্যস্ত হয়ে গেলাম ঘুরে দেখার জন্য। পশ্চিম পরগনার দিকে যাওয়ার পথে পড়ে এই ষ্টুডিওটি। ঢুকার সময় দেখলাম রাস্তার ওল্টো পাশে উত্তম কুমারের একটি মূর্তি। ষ্টুডিওর নিরাপত্তা কর্মী জানালো, উত্তম-সুচিত্রা এই ষ্টুডিওটিতেই তাদের বেশির ভাগ ছবির কাজ করেছেন। তিনি আমাকে উত্তম-সুচিত্রার মেইক-রুমও খুলে দেখালেন। খুলে দেখানোর কথা বললাম এই জন্য যে উত্তম-সুচিত্রা চিত্রজগত থেকে সরে যাওয়ার পর থেকে তাদের মেইক-আপ রুম দুটিতে তালা লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। সে রুমগুলোতে কোনো তারকা বসতে চান না। তারা মনে করেন, অই রুমে মেইক-আপ নেওয়াটা বেয়াদবি হবে।

দুপুর নাগাদ তিনি ফ্রি হয়ে গেলেন। বললেন, চলো আমরা বসি। তার মেইক-আপ রুমে গিয়ে বসলাম। আমরা কথা শুরু করে বেশ কিছু দূর এগিয়েছি, এই সময় আনন্দবাজার পত্রিকার একজন রিপোর্টার বিনা অনুমতিতে রুমে ঢুকে। তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলেন, আমি একজন বিদেশি সাংবাদিকের সঙ্গে কথা তুমি এভাবে রুমে ঢুকে গেলে। ওম পুরীর অগ্নিমূর্তি দেশে রিপোর্টারটি সরি বলে বললো, আমি একটু পর আসি। কিন্তু ওম পুরী বললো, না আমি তোমার সঙ্গে কথা বলব না। ছেলেটি দাঁড়িয়ে থাকলো। ওম পুরী কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলতে গেলে ছেলেটিকে ধাক্কা মেরে রুম থেকে বের করে দিল এবং বললো, তোমাকে যেন আমার দরজায় আর না দেখি। ছেলেটি হতাশা আর অপমান নিয়ে রুম থেকে চলে গেল।

আমি অবাক বিস্ময়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকলাম। ওম পুরী বললো, অবাক হওয়ার কিছু নেই। আমি নিজেকে বাচাঁনোর জন্য তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছি। সে আমাকে কি প্রশ্ন করবে জানো? সে বলবে, তুমি সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে কাজ করেছ, এখন কাজ করছ তার ছেলের সঙ্গে। কাকে তোমার কাছে শ্রেষ্ঠ মনে হয়েছে। এর কোনো জবাব নেই আমার কাছে। আমি যাই বলি না কেন কাল কলকাতায় আমার বিরুদ্ধে মিছিল বের হবে। আমি পরে তার কাছে বা তার অফিসে ফোন করে ক্ষমা চেয়ে নেব। মিছিলের হাত থেকে তো রক্ষা পেলাম। আমি বললাম, এই প্রশ্ন তো আমারও। আমাকে কি জবাব দেবে? বললো, তোমার দেশে লিখলে সমস্যা হবে না। তবে আমি অনুরোধ করব আমাকে এ প্রশ্নটি কোরনা। তারপরই আচমকা আমার কাছে জানতে চাইলো তোমাদের সৈয়দ সালাহউদ্দিন কেমন আছে? বললাম, তুমি তাকে কিভাবে চেন। বললো, নাসিরুদ্দিন শাহ, সৈয়দ সালাহউদ্দিন জাকি, তোমাদের স্বপনসহ আরও কয়েকজন আমরা একসঙ্গে পুনায় পড়াশোনা করেছি। জাকীকে আমার সালাম দিও।

ওম পুরী বলেন, আমি তোদের বাঙ্গালিদের জামাই। আমি কলকাতায় বিয়ে করেছি। আমার স্ত্রী সুনন্দা আজ সন্ধ্যায় ষ্টুডিওতে আসবে। তোমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেব। তোমাদের পেশায়ই আছে সে। টাইমস অব ইন্ডিয়াতে কাজ করে। সন্ধ্যায় আমরা সবাই চটপটি খেতে যাব।

ওম পুরী অত্যন্ত রসিক মানুষ। ইউনিটের সবাইকে মজার মজার কথা বলে মাতিয়ে রাখেন। তিনি চম্পাকে সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতেন ‘বাংলাদেশের শাবানা আজমী’ বলে। চম্পাও তার সঙ্গে রসিকতা করে বলতো, আপকা নাম তো ডাল পুরী হ্যায়। ওম পুরী বলতো, রাস্তায় এ কথা বলো না তাহলে আমার ভক্তদের মার একটাও মাটিতে পড়বে না। চরিত্রের প্রয়োজনে, ওম পুরীর কাঁধে একটি গামছা থাকতো। তাই চম্পা তাকে ডাকতো গামছাজি। কিন্তু ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালেই তিনি বদলে যেতেন। টার্গেট ছবিতে কাজ করতে গিয়ে চম্পা তার কাছ যথেষ্ট সহযোগিতা পেয়েছেন। প্রতিটি দৃশ্যের চম্পার সঙ্গে আলোচনা করে নিতেন। হিন্দি উচ্চারণ, সংলাপ প্রক্ষেপণ, বিপরীতে তার প্রতিক্রিয়া সবই আলোচনা করে নিতেন। এসব নিয়ে সেদিন তিনি আমার সঙ্গে বিস্তারিত কথা বলেছেন। ফিরে এসে আমি পাক্ষিক আনন্দবিচিত্রার জন্য যে প্রচ্ছদ প্রতিবেদন লিখেছি, তাতে প্রায় সব কথাই লেখা হয়েছে।

এরপর থেকে প্রতিদিনই তার সঙ্গে আমার কথা হতো। সেটা আর শিল্পী ও সাংবাদিকতার আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। আমার দেশে ফেরার একদিন আগে আমাকে বললেন, তুমি আরও এক সপ্তাহ থাক। আমি পরশু মুম্বাই ফিরে যাব। একদিন পর প্রেম প্রতিজ্ঞা ছবির আউটডোরে যাব। সেখানে ঋষি কাপুর আর মাধুরী দিক্ষীত আছে। চলো, মাধুরীর একটা সাক্ষাৎকার নেওয়ার ব্যবস্থা করে দেব। আমার ছুটি শেষ হয়ে যাচ্ছিল বলে রাজী হতে পারিনি। সঙ্গে চম্পাও বললো চলে যান, আপনি মুম্বাই থেকে ফিরে আসা পর্যন্ত আমি কলকাতা থাকব। বললাম, সম্ভব নয়। এই রিপোর্ট দ্রুতই আনন্দবিচিত্রায় ধরাতে হবে। সবাই আমার অপেক্ষায় আছে। ওম পুরী বলল, ঠিক আছে, তুমি সময় করে মুম্বাই আস। নিমন্ত্রণ থাকল। মুম্বাইতে  তুমি আমার অতিথি হিসেবে থাকবে। সব খরচ আমার। আমি বললাম, ঠিক আছে, কথা দিলাম। আমি আসব এবং আপনার অতিথি হয়েই থাকব।

এমনি একজন আন্তরিক, রসিক, প্রতিভাবান বহুমাত্রিক অভিনেতা আকস্মিক সবাইকে ছেড়ে চলে গেলেন, সেটা কষ্টদায়কই। তার নিমন্ত্রণ আর রক্ষা করা হলো না আমার।