আলাদা আলাদা ভর্তি পরীক্ষার নামে অমানুষিক নির্যাতন ও লাগামছাড়া খরচ

0
419
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি প্রার্থীদের ও তাদের অসহায় অভিভাবকগণের “অসহনীয় কষ্ট ও লাগামছাড়া খরচ” থেকে মুক্তি দেয়ার লক্ষে আমার এ অব্যহত বিনম্র প্রচেষ্টা। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সাধারণ শিক্ষক ও পাশাপাশি একজন ভবিতব্য অভিভাবক হিসেবে বিবেক তাড়িত হয়েই এ বিষয়ে কিছু লিখব বলে শুধুই ভাবছিলাম, প্রতিক্ষায় ছিলাম ভর্তি পরীক্ষার আগে আগে লিখব বলে, যাতে সংশ্লিষ্টরা এতদসংক্রান্ত বিষয়ে যথোপযোগী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে

gaffar sir1

পারেন। আমরা খুব ভাল করেই জানি, প্রতি বছর উচ্চমাধ্যমিকে শুধুমাত্র জিপিএ -৫ পাওয়া ছাত্র-ছাত্রীদের তুলনায় সবমিলিয়ে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে ভর্তিযোগ্য আসন সংখ্যা খুবই অপ্রতুল। এতে করে ভর্তির জন্য ছাত্র-ছাত্রীদেরকে এক মরণপণ যুদ্ধে লিপ্ত হতে হয়, আর অভিভাবকগণের অনেকেরই এ যুদ্ধের রসদ যোগাতে যোগাতে নাভিশ্বাস উঠে যায়। ভর্তির জন্য সৃষ্ট যুদ্ধ যুদ্ধ খেলায় যাতে পরাজয় বরণ করতে না হয় সে ভরসা দেয়ার জন্য ব্যাঙের ছাতার মত যত্রতত্র গজিয়ে উঠা কোচিং সেন্টারগুলো তো আছেই, এমন কি আট দশ লক্ষ টাকা খরচ করলে আর কোন চিন্তাই নাই, নিশ্চিত জয়। অর্থাৎ অধিক টাকা খরচ করলে তো প্রশ্নপত্র আগেই হাতে পাওয়া যাবে বা ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ না করলেও চান্স পাওয়া যাবে এমন মোবাইল বার্তা অভিভাবকগণ প্রায়শই পেয়ে থাকেন। কোচিং সেন্টারের বড় ভাইয়ারা বা আপুরা তো অন্যজনের পরীক্ষা দিতে এসে হাতে নাতে ধরাও পরেন, এই তো গত বছর আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরাও এমন কয়েকজনকে ধরে আইন-শৃংখলা বাহিনীর হাতে সোপর্দ করতে পেরেছি। না, অন্যদিকে চলে যাচ্ছি। লিখতে চেয়েছিলাম, ছেলে মেয়েরা ভর্তি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে আকাংখিত মেডিকেল কলেজে বা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতে ভর্তি হতে পারে এমন আশা নিয়ে ছেলে মেয়েদেরকে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ করার পর পরই অনেক টাকা খরচ করে কোচিং সেন্টারে ভর্তি করে দেন। সময় সময় কোচিং সেন্টারের আরোপকৃত ফি, যাতায়াত, টিফিন খরচ ইত্যাদি দিতে দিতে হাতের সম্বল যা কিছু থাকে তা অনেক অভিভাবকগণ শেষ করে ফেলেন । টাকা পয়সা খরচ করার আর এক খেলা ঘনিয়ে আসছে। মেডিকেল কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বেশ কাছাকাছি সময়ের মধ্যে ভর্তি পরীক্ষা নামক যুদ্ধের দামামা বেজে উঠে। তারপর শুরু হয় ভর্তি পরীক্ষার রেজিস্ট্রেশনের এসএমএস খেলা, যে খেলায় গোল দেয় কিছু ব্যাংক, মোবাইল কোম্পানি ও কম্পিউটার-ইন্টারনেট ব্যবসায়িরা; বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও যেন এরকম স্বল্পশ্রমে গোল দিতে একটুও পিছিয়ে নেই। অপরদিকে গোল খায় শুধু ভর্তিপ্রার্থীরা আর তাদের অভিভাবকগণ। তারপর প্রিয় সন্তানদেরর নিয়ে অভিভাবকগণের ছুটতে হয় আজ চট্টগ্রামে তো কাল রংপুরে, পরশু সিলেট তো পরের দিন রাজশাহী, তারপর নোয়াখালী আবার হয়তো বা দিনাজপুরে। আসলে তার আর পর নাই, এভাবে ভর্তিচ্ছু ছাত্র-ছাত্রী এবং অভিভাবকগণের চরকিঘুরা বা পুতুলনাচ চলতেই থাকে। বুঝেছেন তো, আমি লিখতে গিয়েই ক্লান্ত হয়ে গেলাম। যাই হোক, এমন মর্মস্পর্শী বিষয় মর্মে মর্মে উপলব্ধি করে আমার পূর্বেই অনেক গুণীজনেরা (বিশেষ করে প্রফেসর ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল স্যার, প্রফেসর ড. কায়কোবাদ স্যার, আরও অনেকে) তা সুরাহার জন্য সংশ্লিষ্ট সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারলেও অদ্যাবধি সুরাহা হয়নি। ভর্তিচ্ছু এসব কোমলমতি ছেলে মেয়েদের ভর্তি পরীক্ষার নামে অমানুষিক নির্যাতন কোন কোন মাননীয় উপাচার্যগণের মর্মকে স্পর্শ করতে না পারলেও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সর্বোচ্চ অভিভাবক (আচার্য) মহামান্য রাষ্ট্রপতির মর্ম কিন্তু সত্যি সত্যি স্পর্শ করতে পেরেছিল। তাই তিনি এমন দু:সহ নির্যাতন থেকে এসব ভর্তিচ্ছু ছাত্র-ছাত্রী ও তাদের অসহায় অভিভাবকদের রেহাই দিতে গতবছর এক সম্মেলনে মাননীয় উপাচার্যগণকে সম্মিলিত ভর্তি পরীক্ষা নিতে অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু, অত্যন্ত দু:খের বিষয়, সেই অনুরোধ বাস্তবায়নের কোন পদক্ষেপ আজও নেয়া হয়নি। তার কারণ কিন্তু খুব একটা বেশী নয়, সবচেয়ে বড় কারণ হলো বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যকার অনৈক্যতা। কমপক্ষে যেসব বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একই গোত্রের, সেসব যেমন কৃষি বিষয়ক, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক এবং সাধারণ বিজ্ঞান, মানবিক ও বাণিজ্যিক বিষয়ক তারা আলাদা আলাদা ভর্তি পরীক্ষার নামে অমানুষিক নির্যাতনের কথা বিবেচনা করে একইদিনে একই প্রশ্নপত্রের মাধ্যমে ভর্তি পরীক্ষা নিলে পরীক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকগণের দু:খ কষ্টের অনেকটাই লাঘব হত বলে আমারও মনে হয়।

gaffar sir2

মেডিকেল কলেজগুলো পারলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কেন পারবে না? মেনে নিচ্ছি যে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পরিসর অনেক বড়, যার যার স্বকীয়তা বা স্বাধীনতাও আছে, মান ধরে রাখতে হবে, ইত্যাদি। তাতে কি, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মঙ্গলের জন্য একটু ত্যাগ স্বীকার করলে কিইবা ক্ষতি হবে? পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চলে সরকারের তথা জনগণের করের টাকায়; ভর্তি পরবর্তী গ্র্যাজুয়েট তৈরিতে সরকার যদি কোটি কোটি টাকা খরচ করতে পারে, তবে ভর্তি পরীক্ষা বা ভর্তি কার্যক্রম চালানোর জন্য সামান্য কিছু অর্থ বরাদ্দ দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি বানিজ্য কি বন্ধ করতে পারে না? এ কাজটাতো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অর্থবরাদ্দের দায়িত্বে ন্যাস্ত প্রতিষ্ঠান “বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)” খুব সহজেই করতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য প্রতি বছরের ভর্তি পরীক্ষাসহ ভর্তি কার্যক্রম একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, অথচ লোকজন ইহাকে ভর্তি বানিজ্য আখ্যায়িত করছে কেন তা ভাবা উচিৎ নয় কি? আমিও এসবের একজন অংশীদার বলে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি, আর এসবের সাথে সংশ্লিষ্ট সকলের নিকট ক্ষমা চাচ্ছি একজন ভবিষ্যৎ অভিভাবক হিসেবে। প্রতি বছরই প্রায় সবকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি কার্যক্রম সম্পাদনের জন্য একটা মুল ভর্তি কমিটি ও এর সহায়ক আরও ৭-৮ টা উপকমিটি গঠন করা হয়। বিগত দিনের কিছু অপ্রিয় অভিজ্ঞতা ও অন্যন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকর্মীদের তথ্যের আলোকে সত্যিটা তুলে ধরার ক্ষাণিকটা চেষ্টা করলে দোষেরই বা কি। এসব কমিটি বা উপকমিটিগুলো কোন নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে পছন্দসই শিক্ষক কর্মকর্তা নিয়ে গঠন করা হয়ে থাকে। দেখা গেছে যোগ্য, দক্ষ, আগ্রহী অধ্যাপকদের বা জ্যেষ্ঠদের বাদ দিয়ে অযোগ্য, অদক্ষ কনিষ্টরা এসব উপকমিটিতে স্থান পেয়ে দিব্যি জ্যেষ্ঠদের উপর মাতাব্বরি চালায়। এমন অনেক অধ্যাপক আছেন যাদের কখনোই এসব উপকমিটিতে স্থান হয়নি। এসব কমিটি বা উপকমিটিতে অন্তর্ভুক্তির সৌভাগ্যবানেরা সাধারণ শিক্ষকদের চেয়ে ৩-১০ গুন বেশি অর্থ নিয়ে থাকেন, যা এসব খন্ডকালীন পরিশ্রমের পারিশ্রমিক বা পারিতোষিক কোনটার মধ্যেই পরে না। হ্যা, আমিও একজন নীচু শ্রেণীর অধ্যাপক (সাধারণ শিক্ষক) হিসেবে এই অর্থ পেয়ে থাকি, তবে তা অনেক সহকারী অধ্যাপকদের চেয়েও অনেক কম। হিসেব কষে পারিশ্রমিকটা রেখে সিংহভাগটা ছাত্রকল্যাণে বা জনকল্যাণে ব্যয় করার চেষ্টা করি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আমার কয়েকজন সহকর্মী শিক্ষক বললেন, শুধুমাত্র এসব কমিটি বা উপকমিটির নাস্তা খাওয়া বাবদ ৮-৯ লক্ষ টাকা খরচ দেখানো হয়। জানি না, কি কারণে ভর্তি পরীক্ষার আয় ব্যায়ের কোন অডিট হয় না। আর তাই ইচ্ছে মত ভর্তিপ্রার্থীদের কাছ থেকে আদায় করা মোটা অংকের অর্থ ব্যবহারেও কোন সমস্যা হয় না। ভর্তি পরীক্ষা নেয়া বা ভর্তি কার্যক্রম একটা অতি গুরুত্বপূর্ণ ও আনন্দঘন বিষয়, অথচ এসব অনিয়মের কারণে অনেকেই অনেক মনকষ্ট নিয়ে ভর্তি পরীক্ষা বা ভর্তি কার্যক্রমের দায়িত্ব পালনে বাধ্য থাকেন। এখন বলুনতো লোকে কেন এটাকে ভর্তি বানিজ্য বলবে না? সুতরাং, সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি বাণিজ্য পরিহার করার জন্য আমার দু’টো সুনির্দিষ্ট বিকল্প প্রস্তাব রয়েছে যা মহামান্য রাষ্ট্রপতি (আচার্য) দয়া করে মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী, চেয়ারম্যান (ইউজিসি) ও উপাচার্যগণের মাধ্যমে বাস্তবায়নের ব্যবস্থা নিতে পারেন। ১। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ভর্তিপ্রার্থীদের কাছ থেকে ভর্তি পরীক্ষা ফি বাবদ সর্বোচ্চ একশত টাকা নিতে পারবেন। অথবা, ২। ইউজিসি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে প্রতিটি ভর্তি আসনের বিপরীতে এক হাজার টাকা হারে প্রয়োজনীয় অর্থের বরাদ্দ দিবে, তবে শর্ত থাকবে প্রতিটি আসনের বিপরীতে প্রাথমিক বাছাইকৃত (বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মত) সর্বোচ্চ দশজনকে সংশ্লিষ্ট ভর্তি পরীক্ষায় অংশ গ্রহণের সুযোগ দিতে পারবে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মহামান্য রাষ্ট্রপতির অনুরোধটি আমলে নিয়ে সম্মিলিতভাবে (বা গুচ্ছাকারে) ভর্তি পরীক্ষা নেয়ার ব্যবস্থা গ্রহণে আর বেশী কালক্ষেপণ করবেন না। আশা করি এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রতি সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধাবোধও বাড়ত। আবার গরীব অসচ্ছল, নিম্নবিত্ত বা নিম্ন মধ্যবিত্ত অভিভাবকগণের আর্থিক কষ্টের কিছুটা হলেও লাঘব হত। জানি না, আমার এ কথাগুলো মহামান্য রাষ্ট্রপতিসহ সংশ্লিষ্ট সকলের দোরগোড়ায় পৌছাবে কি না। আর যদি তা না হয়, তবে একজন বিজ্ঞ আইনজীবীকে অনুরোধ করব তিনি যেন জাতীর মহান স্বার্থে স্বপ্রণোদিত হয়ে এই মর্মে একটা রীট আবেদন করেন “পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ‘ভর্তি পরীক্ষা ফি’ ব্যতিত কেন ভর্তি পরীক্ষা নেয়া হবে না”। আমি ভাল করেই জানি, আমার এ লেখা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের আমার প্রিয় অনেক সহকর্মী শিক্ষকগণকে মর্মাহত করবে; মর্মাহত তারাই হবেন যাদের একটা বড় ধরণের অনৈতিক আর্থিক ক্ষতি হয়ে যাবে; সেজন্য করজোড়ে ক্ষমা চাচ্ছি। তবে, তার চেয়েও অনেক অনেক বেশী মানুষ আর্থিক, শারীরিক এবং মানসিকভাবে উপকৃত হবেন। যাই হোক, সবশেষে বলতে চাই, আমাদের এ প্রচেষ্টা শুধুই জাতীয় স্বার্থে, ভবিষ্যতের উন্নত বাংলাদেশের রূপকার লক্ষ-কোটি ছেলে মেয়েদের জন্যে।

লেখক:ড. আব্দুল গাফফার মিয়া ,  অধ্যাপক, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুর।