আজ শুরু হচ্ছে একুশে গ্রন্থমেলা

0
29

একুশে গ্রন্থমেলামোরসালিন মিজান ॥ একুশ মানে মাথানত না করা। সেই একুশের মাস ফেব্রুয়ারির প্রথম দিন আজ। আজ বুধবার থেকে ভাই হারানোর ব্যথা আর মায়ের ভাষার মর্যাদা রক্ষার গৌরবে শুরু হচ্ছে অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৭। বাংলা ভাষা সাহিত্যের চর্চা, বিকাশ, বাঙালী সংস্কৃতির বহমান উদার অসাম্প্রদায়িক ধারায় অনন্য সংযোজন গ্রন্থমেলা বিকেলে উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাঙালী জাতিসত্তা ও বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষের প্রতীক বাংলা একাডেমির আয়োজনে মেলায় অংশ নেবে দেশের প্রায় সকল প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান। বই প্রকাশ প্রদর্শনী ও বেচা-কেনার এমন বর্ণাঢ্য আয়োজন সারাবিশ্বেই বিরল। বাঙালীর আবেগ-ভালবাসার অনিন্দ্যসুন্দর প্রকাশ গ্রন্থমেলা একইসঙ্গে বাঙালী সংস্কৃতির উৎসবে পরিণত হয়েছে।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি মায়ের ভাষা বাংলার মর্যাদা রক্ষায় রাজপথে নেমে এসেছিল বাঙালী। রফিক, শফিক, বরকত, জব্বারের তাজা রক্ত গড়েছিল ইতিহাস। নতুন প্রাণ পেয়েছিল আমরি বাংলা ভাষা। একুশের সেই চেতনাকে ধারণ করে অমর একুশে গ্রন্থমেলা। অনন্য সাধারণ শুরুটা করেছিলেন চিত্তরঞ্জন সাহা। ১৯৭২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি বর্ধমান হাউসের বটতলায় চটের বস্তা পেতে বসেছিলেন স্বপ্নবাজ এই প্রকাশক। মাত্র ৩২টি বই। বাংলাদেশী শরণার্থী লেখকদের লেখা এসব বই প্রকাশ করে চিত্তরঞ্জন প্রতিষ্ঠা করেন স্বাধীন বাংলা সাহিত্য পরিষদ (বর্তমান মুক্তধারা প্রকাশনী)। বইগুলো স্বাধীন বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পের প্রথম অবদান। নিজের প্রকাশিত বই নিয়ে একাই উদ্যোগটি অব্যাহত রাখেন চিত্তরঞ্জন। যতদূর জানা যায়, ১৯৭৬ সালে উদ্যোগটির সঙ্গে যুক্ত হয় আরও কয়েকটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান। ১৯৭৮ সালে বাংলা একাডেমি আয়োজনটির সঙ্গে যুক্ত হয়। ১৯৭৯ সালে সংশ্লিষ্ট হয় বাংলাদেশ পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশক সমিতি। কোন কোন সূত্রমতে, ১৯৮৩ সালে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক থাকাকালে কাজী মনজুরে মওলা বাংলা একাডেমিতে প্রথম অমর একুশে গ্রন্থমেলা আয়োজন করেন। বর্তমানে মেলা সম্প্রসারিত হয়েছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান পর্যন্ত। এরই মাঝে চলতি বছরের আয়োজনের সকল প্রস্তুতি শেষ হয়েছে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ॥ অমর একুশে গ্রন্থমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের জন্য প্রস্তুত বাংলা একাডেমির মূল মঞ্চ। কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতিধন্য বর্ধমান হাউসের সামনে বিশাল এই মঞ্চ প্রস্তুত করা হয়েছে। এখানেই বিকেল ৩টায় মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের প্রধান আকর্ষণ। এছাড়াও মঞ্চে থাকবেন বেশ কয়েকজন বিদেশী অতিথি। চীনের প্রখ্যাত গবেষক ও রবীন্দ্র-অনুবাদক ডং ইউ চেন, অস্ট্রিয়ার মেনফ্রেড কোবো, পুয়ের্তোরিকোর লুস মারিয়া লোপেজ, ভারতের চিন্ময় গুহ প্রমুখ। প্রকাশক-প্রতিনিধি হিসেবে বক্তব্য রাখবেন বহু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থের প্রকাশক মফিদুল হক। সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরের সভাপতিত্বে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখবেন মন্ত্রণালয়ের সচিব বেগম আক্তারী মমতাজ। স্বাগত ভাষণ দেবেন একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান। গ্রন্থমেলার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ২০১৬ প্রদান করা হবে। প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেয়া হবে বাংলা একাডেমি প্রকাশিত দুটি উল্লেখযোগ্য বই। একটি মীর মশাররফ হোসেনের অমর সৃষ্টি বিষাদ সিন্ধুর ইংরেজী অনুবাদ ‘ঙপবধহ ড়ভ ঝড়ৎৎড়’ি. অন্যটি হারুন-অর-রশিদের লেখা ‘মূলধারার রাজনীতি : বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কাউন্সিল ১৯৪৯-২০১৬’। জার্মানি থেকে প্রকাশিত ‘ঐঁহফৎবফ চড়বসং ভৎড়স ইধহমষধফবংয’ এবং ক্রিস্টিয়ান কার্লসন অনূদিত সুইডিশ ভাষায় বাংলাদেশের কবিদের কবিতা সংকলন ‘ইবহমধষ ওংশধ গড়ষহ’ বই দুটিও উপহার দেয়া হবে প্রধানমন্ত্রীকে। উদ্বোধনী আনুষ্ঠানিকতা শেষে মেলার বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখবেন প্রধানমন্ত্রী। কিনবেন পছন্দের বইও।

আরও সফল মেলার প্রত্যাশা একাডেমির ॥ এবারের মেলা আরও পরিচ্ছন্ন এবং গোছালো হবে বলে জানিয়েছেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান। তিনি বলেন, অমর একুশে গ্রন্থমেলার মধ্য দিয়ে সাংস্কৃতিক জাগৃতি ঘটে। এবার এটি আরও সুগঠিত হবে। মানবিক হবে। মানুষে মানুষে সম্প্রীতি বাড়াতে ভূমিকা রাখবে অমর একুশে গ্রন্থমেলা।

প্রকাশকদের কথা ॥ সম্মিলিত প্রয়াসের গুরুত্বপূর্ণ অংশজুড়ে আছেন প্রকাশকরা। মেলা শুরুর একদিন আগে কথা হয় তাদের প্রতিনিধি প্রকাশক ওসমান গনির সঙ্গে। কিছুটা অভিযোগের সুরেই তিনি বলেন, মেলাটি প্রকাশকদেরও। একাডেমি এবং প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো মিলে বিশাল এই আয়োজন সফল করে তুলে। কিন্তু অন্যান্য বছরের মতো এবারও আমরা দেখছি, প্রকাশকদের সঙ্গে কথা না বলেই অনেক সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে। আমাদের একাডেমির মহাপরিচালকের কাছে যেতে হচ্ছে এই দাবি ওই দাবি নিয়ে। এই অবস্থার পরিবর্তন দাবি করে তিনি বলেন, একাডেমির সভাপতি আনিসুজ্জামানসহ বিদগ্ধজনেরা মেলা আয়োজনের দায়িত্ব প্রকাশকদের হাতে ছেড়ে দিতে বলেছেন। এটি ভেবে দেখার সময় এসেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

৩২৯ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ॥ এবারের মেলায় অংশ নিচ্ছে ৩২৯টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান। থাকছে অন্যান্য ৮০টি প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকাশিত বই। একাডেমি প্রাঙ্গণ এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বাংলা একাডেমির ২টি প্যাভিলিয়ন, একাডেমির শিশুকিশোর প্রকাশনাভিত্তিক বিক্রয়কেন্দ্র এবং একাডেমির সাহিত্য মাসিক উত্তরাধিকার-এর বিক্রয়কেন্দ্র থাকবে। মেলা ছুটির দিন ছাড়া প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে সাড়ে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকবে। ছুটির দিন বেলা ১১টা থেকে রাত সাড়ে ৮টা এবং ২১ ফেব্রুয়ারি সকাল ৮টা থেকে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত চলবে।

নতুন বিন্যাস ॥ এবার কিছুটা নতুনভাবে বিন্যস্ত করা হয়েছে মেলা। সোহ্রাওয়ার্দী উদ্যানের অধিকাংশ স্টল পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে আনা হয়েছে। টিএসসি ও দোয়েল চত্বরের মূল প্রবেশ পথে এলইডি মনিটর স্থাপন করা হচ্ছে। এখান থেকে মেলা সম্পর্কিত প্রয়োজনীয় তথ্য ও নির্দেশনা পাওয়া যাবে। বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ‘নতুন বইয়ের প্রদর্শনশালা’ করা হয়েছে। এতে প্রতিদিন প্রকাশিত নতুন বই দিনভিত্তিক সাজানো থাকবে।

সকল আয়োজন সম্পন্ন ॥ মেলা আয়োজনের সকল প্রস্তুতি ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। একাডেমি চত্বর ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্টল প্যাভিলিয়ন নির্মাণ শেষ হয়েছে। নিজেদের মতো করে গুছিয়ে নিয়েছেন প্রকাশকরা। মঙ্গলবার মেলা প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা যায়, মোটামুটি প্রস্তুত সব। উৎসবের একটা আমেজ টের পাওয়া যায়। এবারও দুটি ভেন্যুতে অনুষ্ঠিত হবে অমর একুশে গ্রন্থমেলা। ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে থাকছে মূল আয়োজন। এখানে প্রায় ৪ লাখ বর্গফুট জায়গা। ১২টি চত্বরে সজ্জিত করা হয়েছে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে ৩২৯টি প্রতিষ্ঠানের ৫৪৯টি ইউনিট বরাদ্দ দেয়া হযেছে। একাডেমি প্রাঙ্গণে ৮০টি প্রতিষ্ঠানকে দেয়া হয়েছে ১১৪টি ইউনিট। মোট ৪০৯টি প্রতিষ্ঠানকে ৬৬৩টি ইউনিট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। বাংলা একাডেমিসহ ১৫টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান নিজেদের পছন্দ মতো প্যাভিলিয়ন সাজিয়েছে। লিটলম্যাগ কর্নারও প্রস্তুত। এখানে জায়গা পাবে ১০০টি লিটল ম্যাগাজিন। ক্ষুদ্র প্রকাশনা সংস্থা এবং ব্যক্তি উদ্যোগে যারা বই প্রকাশ করেছেন তাদের বই বিক্রি ও প্রদর্শনের ব্যবস্থা থাকবে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের স্টলে। মেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে থাকবে শিশুকর্নার। এই কর্নারকে শিশুকিশোর বিনোদন ও শিক্ষামূলক অঙ্গসজ্জায় সজ্জিত করা হবে। মাসব্যাপী গ্রন্থমেলায় এবারও ‘শিশুপ্রহর’ ঘোষণা করা হবে।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা থাকবে। অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৭-এর প্রচার কার্যক্রমের জন্য তথ্যকেন্দ্র থাকবে বর্ধমান ভবনের পশ্চিম বেদিতে এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে।

মেলা মঞ্চের আয়োজন ॥ ৫ ফেব্রুয়ারি থেকে প্রতিদিন বিকেল ৪টায় গ্রন্থমেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে সেমিনার। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি-রাজনীতি-সমকালীন প্রসঙ্গ এবং বিশিষ্ট বাঙালী মনীষার জীবন ও কর্ম নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। প্রতিদিন সন্ধ্যায় থাকবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

নিরাপত্তা জোরদার ॥ মেলার সার্বিক নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করবেন বাংলাদেশ পুলিশ, র‌্যাব, আনসার, বিজিবি ও গোয়েন্দা সংস্থাসমূহের নিরাপত্তাকর্মীরা। নিñিদ্র নিরাপত্তার জন্য মেলায় আড়াইশ’ ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার ব্যবস্থা করা হয়েছে। গ্রন্থমেলার প্রবেশ ও বহির্গমন পথে পর্যাপ্ত সংখ্যক আর্চওয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। মেলা শুরুর একদিন আগে মঙ্গলবার সকালে গ্রন্থমেলার নিরাপত্তা ব্যববস্থা সরেজমিনে দেখতে যান ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া ও কাউন্টার টেরিজম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম। পরে ডিএমপি কমিশনার সাংবাদিকদের বলেন, গ্রন্থমেলা ঘিরে কোন নিরাপত্তা হুমকি নেই। প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। তবে কোন লেখক বা প্রকাশক অথবা কোন ব্যক্তি যদি বিশেষ নিরাপত্তা ঝুঁকি মনে করেন তাহলে পুলিশ কন্ট্রোল রুম বা শাহবাগ থানায় জানানো হলে তাকে নিরাপত্তা দেয়া হবে। তিনি যতক্ষণ চাইবেন ততক্ষণ পুলিশের পক্ষ থেকে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হবে। একদিন আগে বাংলা একাডেমিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান বলেছিলেন, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয় এমন কোন বই মেলায় আছে কিনা, তা খতিয়ে দেখার কাজ করবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বই নিষিদ্ধ ও স্টল বন্ধের কাজ নিজের মতো করে ওই মন্ত্রণালয় করবে বলে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন তিনি। এমন খবরে বিভিন্ন মহলে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। এর প্রেক্ষিতে ডিএমপি কমিশনার বলেন, আমরাও মুক্তচিন্তায় বিশ্বাসী। পুলিশের নজরদারি মুক্তিচিন্তাকে বাধাগ্রস্ত করবে না। কিন্তু মুক্তচিন্তা করতে গিয়ে কেউ যদি মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেন, গোষ্ঠীগত দাঙ্গা সৃষ্টিতে উসকানি দেন, কারও মৌলিক অধিকার ক্ষুণœ হয় তাহলে সেটা মুক্তচিন্তার মধ্যে পড়ে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।