যেভাবে উত্থান নূর হোসেনের

0
15

ডেস্ক রিপোর্টঃ নারায়ণগঞ্জের বহুল আলোচিত-সমালোচিত চরিত্রের নাম নূর হোসেন। এই ব্যক্তিকে ঘিরে গেল তিন দশক ধরে নারায়ণগঞ্জে চলেছে মাদক, চোরাচালান ও হত্যা-খুনসহ নানা অপকর্ম। অবশেষে সেভেন মার্ডারে ফেঁসে যান তিনি। বেরিয়ে আসে তার অপরাধ জগতের নানা কাহিনী।

কে এই নূর হোসেন

অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৯৮৫ অথবা ১৯৮৬ সালে সিদ্ধিরগঞ্জ পুল এলাকায় ইকবাল গ্রুপের ট্রাকের হেলপার ছিল নূর হোসেন। এরপর ড্রাইভিং শিখে একই গ্রুপে চাকরি করে সে। ১৯৮৮ সালে শিমরাইলে আন্তঃজেলা ট্রাক চালক শ্রমিক ইউনিয়নের কার্যক্রম চালু করেন দাইমুদ্দিন নামে এক ট্রাক ড্রাইভার। তার হাত ধরেই নূর হোসেন হেলপার হিসেবে যোগ দেয় ইকবাল গ্রুপে। তবে পরের বছরই দাইমুদ্দিনকে বের করে দিয়ে শ্রমিক ইউনিয়নের দখল নেয় নূর হোসেন, যোগ দেয় জাতীয় পার্টিতে। কিন্তু ১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে কাজ করে হয়ে যায় বিএনপি নেতা, গঠন করে সন্ত্রাসী বাহিনী।

১৯৯১ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকার অপরাধ জগতের নিয়ন্ত্রক ছিল নূর হোসেন। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হওয়ায় তার পরিচয় হয় হোসেন চেয়ারম্যান। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ইউপি চেয়ারম্যান থাকার সময় এলাকার স্থাবর সম্পত্তি বিক্রি, পরিষদের তহবিল তছরুপ, বন্যার্তদের অর্থ ও ত্রাণসামগ্রী আত্মসাতসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনের পরই গাঢাকা দেয় সে।

১৯৯২ সালে সিদ্ধিরগঞ্জ ইউপি চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হয় নূর হোসেন। নির্বাচনে জিতে সে প্রভাব বিস্তার করে পুরো সিদ্ধিরগঞ্জে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি প্রার্থী হিসেবে পরবর্তী ইউপি নির্বাচনেও চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হয় নূর হোসেন। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে শামীম ওসমান প্রার্থী দেয় নজরুলকে। এবার খোদ শামীম ওসমানের প্রতিপক্ষ গিয়াসউদ্দিন জোরেশোরে মাঠে নামেন নূর হোসেনের পক্ষে। কিন্তু নূর হোসেন জয়ী হয়ে হাত মেলায় শামীম ওসমানের সঙ্গে। শামীম ওসমানের ঘনিষ্ঠ শীর্ষ সন্ত্রাসী মাকসুদ ও সারোয়ারকে নিয়ে সে গড়ে তোলে শক্তিশালী দল।

নূর হোসেন ইন্টারপোলের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী ছিল। ২০০৭ সালের ১২ মার্চ ইন্টারপোল তার বিরুদ্ধে রেড ওয়ারেন্ট জারি করে। অবশ্য এর অনেক আগেই, ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নূর হোসেন তার বাহিনী নিয়ে ভারতে পালিয়ে যায়। ২৩ মামলার গ্রেফতারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে দীর্ঘ সাত বছর ভারতে ফেরারি জীবন কাটায় সে।

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট সরকার ২০০৮ সালের নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় আসার পর ফেরারি জীবনের ইতি ঘটে তার। ২০০৯ সালের ২০ জুন নূর হোসেন নিজ এলাকা নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে ফিরে আসে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শিমরাইল ট্রাক টার্মিনাল থেকে প্রতিটি গাড়ির ট্রিপ বাবদ ৩৫০ টাকা চাঁদা আদায় করতো নূর হোসেন। সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের ১৮টি জেলার প্রায় ৭০টি রুটের শতাধিক বাস কাউন্টার থেকে দৈনিক ৩০০ টাকা চাঁদা আদায় করা হতো। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়ন (বি-৪৯৪) এর শিমরাইল পূর্বাঞ্চলীয় কমিটির রশিদে এ চাঁদাবাজি হতো। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রতি মাসে পরিবহন থেকে অন্তত ৪০ লাখ টাকার উপরে চাঁদা আদায় করা হতো। এছাড়া সিদ্ধিরগঞ্জের হিরাঝিল ও এর আশপাশের এলাকায় গড়ে ওঠা ১৪টি চুন উৎপাদন কারখানা থেকে মাসে অন্তত ৪০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করতো সে।

এভাবে সহজেই সম্পদের পাহাড় গড়েন নূর হোসেন।  শিমরাইলে ১১ শতাংশ জমির ওপর প্রায় ৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫ তলা বাড়ি, ১০ শতাংশ জমির ওপর প্রায় ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৬ তলা বাড়ি, আরেকটি ৬ তলা ভবন, রসুলবাগে সাড়ে ৮ কাঠা জমির ওপর ৭ তলা ভবনসহ ৫টি বিলাসবহুল বাড়ি ও ৪টি ফ্ল্যাটের মালিক নূর হোসেন। শিমরাইলের টেকপাড়ার বাড়ির পিছনে প্রায় ৪০ বিঘার ওপরে মৎস্য খামারও আছে তার। রাজধানীর গুলশান-২এ দু’টি ফ্ল্যাটেরও মালিক নূর হোসেন। বনানী ও ধানমন্ডিতে আরও ২টি ফ্ল্যাট রয়েছে তার। অন্তত ৫০ বিঘা জমিরও মালিক তিনি।

সূত্র : আরটিএনএন