তারুণ্যের হাত ধরে ভাষার মিনার

0
38

বসন্ত এসে গেছে। ফাল্গুনের প্রথম রোদ বিদায় জানিয়ে দিল শীতবুড়োকে। মনের সব ক’টা দরজা খুলে অনেকটা প্রকাশ্য দিবালোকেই নিমন্ত্রণ জানাল ঋতুরাজ বসন্তকে। রাজা বলে কথা- গোলাপ ছাড়া যেমন ভালোবাসা পূর্ণতা পায় না, তেমনি বসন্ত ছাড়া ঋতুরও যেন পূর্ণতা আসে না! আসতে পারে না। প্রকৃতিতে ভালোবাসা বিলাতেই আগমন বসন্তের।মিনার

এ বসন্তের কত ছন্দ, কত গন্ধ। হলুদ বা রক্ত গাঁদা, বেলি কিংবা জুঁই আবার ছোট্ট ক্যালেনডুলারা সদলবলে বসন্তের রূপ বিলিয়ে যায় অনেকটা বর্ষায় গ্রাম থেকে নদীর দিকে ছুটে যাওয়া খালের মতো করে। বসন্তের রূপ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দিতে যেমন অনেক ফুল ফোটে, ডেকে যায় কিশোরী কোকিল; ঠিক তেমনি নিজেকে রাঙাতে আপনিও মিশে একাকার হয়ে যান বসন্তের সঙ্গে।

জানি, এ কৌশলের ট্রাকে নিজেকে যেমনই ছোটান না কেন; ক্ষণিকের জন্যও ভুলে যান না আপনার নিজস্ব ভাষা। আপনি নিশ্চয়ই প্রিয় মানুষটির সঙ্গে খেপে গেলেও চিৎকার করে ওঠেন বাংলায়। কারণ এ বাংলা যে মিশে আছে আপনার অস্তিমজ্জায়!

বুকে আগলে ভাষা

চায়ের কাপ থেকে শুরু করে বাদাম খোসা- সর্বত্রই ছড়িয়ে থাকে আপনার মধুর ভাষা। যার সামনে বারবার আপনার মাথা নুইয়ে আসে। নীরবে-নিভৃতে বিনম্র শ্রদ্ধায় আপনি মাথা নুইয়ে দেন ভাষার মিনারে। কারণ তারুণ্যের আকাশ কখনও ঘোলাটে হয় না। স্বপি্নল এ আকাশ মাথায় নিয়ে চলা তরুণরা দলছুট রাতকানাদের দলে নয়, বুবুন চিলের মতো প্রসারিত তাদের দৃষ্টি। তারা জানে, ভাষা-আন্দোলনের লক্ষ্যে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবির সঙ্গে ছিল ভাষার ব্যবহার সংক্রান্ত একাধিক দাবি-দাওয়া। তারা জানে, তাতে ছিল সর্বস্তরের বাংলার প্রচলনও।

জানি, সর্বস্তরে বাংলার প্রচলনের পথে হাঁটছেন আপনিও। এও জানি যে, আপনারা যা কিছু মহান তার সঙ্গেই আছেন, থাকবেন। নিজের মতো করে দেশটাকে বুকে বাঁধেন, এ বাংলা ভাষাটাকে আগলে নিয়ে ছুটে চলুন মহাজাগতিক কোনো নক্ষত্রের দিকে। আর এ দীর্ঘপথে নিশ্চয়ই বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করবেন সেই ভাষা শহীদদের।

নতুন করে নিজেকে চেনা

ক্যাম্পাস, বাসা কিংবা প্রত্যন্ত গ্রামের মেঠোপথে আপনি হাঁটছেন। ভেসে বেড়াচ্ছেন আকাশে কিংবা নীল পানি ভেঙে ছুটছেন গন্তব্যের দিকে। গন্তব্য একেকজনের একেকটা হতে পারে। এই হতে পারাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ভাষা? যা দিয়ে আপনি আপনার মনের আকুতি তুলে ধরেন। হৃদয়ের একান্ত গহিনের কথা আওড়ে যান। সে তো সবারই এক। সেই এক ভাষাটাকে বুকে ধারণ করেন বেশ যত্নে। এতে কাউকে দেখানোর কিছু নেই। কেউ আপনাকে প্রশ্নের মুখোমুখিও দাঁড় করাবে না। কারও সেই অধিকারও নেই। আর অধিকার থাকলেও তা আপনি কেন দেবেন? ভাষাটা যে তার মতো আপনারও হাড়ের প্রতিটা ভাঁজে মিশে আছে। লুকিয়ে আছে ঘামের কণায়।

ভাষার গন্ধটা তো আপনার বুক পকেটে লেগেই থাকে! এ ঘ্রাণটা আপনার প্রতিটা কাজে উৎসাহ জুগিয়ে যায়। আপনাকে উত্তাল করে তোলে। উন্মাদনা দেয় এগিয়ে যাওয়ার স্বাপি্নক পথে। ভাষার এ উন্মাদনা বুকে নিয়ে বুকটাকে উঁচু করে হাঁটুন। এতে আপনি যে নিজেকেই নতুন করে চিনতে পারবেন নিজের ভেতর থেকে!

অন্য ভাষার ভিন্ন লোক

এক শ্রেণি আছে ভাষা নিয়ে কান কথা ছড়িয়ে যায়। এই এক শ্রেণি কিংবা ভিন্ন শ্রেণি খোঁজার দরকার নেই আপনার। নিজের জায়গায় থেকে ভাষাটাকে আপনি আগলে রাখুন। ভিন্ন ভাষা আমাদের শিখতেই হয়। জানতেই হচ্ছে তাই বলে ভাষাটাকে মানিব্যাগে ফেলে রেখে নয়। বিদেশিদের সঙ্গে তার ভাষায় কথা বলুন। পারলে তাকে দু-একলাইন বাংলাও শিখিয়ে দিন। কিন্তু নিজেদের মধ্যে কথা বলতে গিয়ে সৃজনশীলতার চর্চাটা চালিয়ে যেতে বাংলাটাকেই সামনে এনে ধরুন।

ভাষার প্রতি আপনার শ্রদ্ধাটা বলে বেড়ানোর চেয়ে কাজে লাগানোটাই গুরুত্বপূর্ণ। আপনাকে উপস্থাপন করতে গেলেও ভাষাটাকে সামনে রাখতে হবে। কান কথায় কান না দিয়ে নিজে ঠিক থাকুন। আশপাশটা ঠিক রাখুন। ভাষার প্রতি যে আত্মত্যাগ, সেটা শ্রদ্ধাভরে মনে গেঁথে রাখুন। ভাষা তখন তার ক্ষমতাবলে আপনাকে পেঁৗছে দেবে সর্বোচ্চ স্থানে।

স্বর্ণালি দিন

ছোট্ট জীবন ভালোই যাচ্ছে আপনার। এই জীবনটা রকেট গতিতে চলতে আছ চলতে থাকুক; কিন্তু কিছু বলতে গিয়ে একটু থমকে দাঁড়ান। কী বলছেন, কার সঙ্গে বলছেন, কেনইবা বলছেন; তা ভাবুন একবার। আপনার ভাষাটা কিন্তু বড্ড ওজনি। পাল্লায় নিলে যার কাছে-পিঠে রাজ্যের ভূরি ভূরি ভাষা ঘেঁষতেই পারবে না। এ ওজনের কল্যাণেই ভাষার দৌড়ে প্রতিনিয়ত এগিয়ে যাচ্ছে বাংলা। আর এ ভাষাটা এখন শুধু বাংলাদেশেই পালিত হচ্ছে না। বিনম্র শ্রদ্ধায় দেশে দেশে পালিত হচ্ছে গৌরবময় মাতৃভাষার এ স্বর্ণালি দিন। জানেনই তো, প্রিয় এ বাংলা ভাষাটাকে রাক্ষসের পেট থেকে টেনে বের করে আজকের ভাষার দৌড়ে ছয় নম্বরে দাঁড় করাতে প্রাণ দিতে হয়েছিল আপনার-আমার পূর্বসূরিদের।

ঠিক ৬৫ বছর আগে

আজ থেকে ঠিক ৬৫ বছর আগে আপনার-আমার মতো তরুণ ছাত্ররাই জেগে উঠেছিলেন ভাষাটাকে ধরে রাখতে। রাক্ষসের পেট থেকে বের করে আনতে। রফিক-বরকতরা শাসকদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ঠিকই নেমেছিলেন রাজপথে। উদ্যত রাইফেলের সামনে বুক পেতে ভেঙে দিয়েছিলেন ১৪৪ ধারা। তখনও হয়তো বসন্ত ছিল। ঠিক আজকের মতো। সেই রোদ ঝলমল বসন্তে উত্তাল হয়ে উঠেছিল, ‘মাতৃভাষা বাংলা চাই’ স্লোগান। তারপর তো ইতিহাস। আমাদের প্রাণ খুলে কথা বলা।

জানি, জীবন নিয়ে আপনি দৌড়ের ওপর আছেন, তা থাক। তবে আপনার তৃষ্ণার জলটা হোক বাংলার। প্রতিযোগিতায় নিজেকে টিকিয়ে রাখতে গেলেও প্রয়োজন শুদ্ধ বাংলা জানা। প্রিয় বাংলায় বিশ্বের কাছে তুলে ধরুন নিজেকে। আপনার চলার পথ আরও সুগম হোক। আর এ ভাষাতেই তৃপ্ত হোক আপনার শেষ চুমুক! হ