তাবলীগের গৃহবিবাদের রেশ ইজতেমায়, ‘অতিথিদের’ বর্জন

0
7

সময়ের পাতা ডেস্কঃতাবলীগ জামায়াতের নেতৃত্বের প্রশ্নে চলমান মতবিরোধের রেশ পড়েছে টঙ্গির বিশ্ব ইজতেমায়।এ বিষয়ে ভারতের তাবলীগ জামায়াতের মতো বিভক্ত হয়ে পড়েছে বাংলাদেশের তাবলীগ জামায়াতও।এরই জেরে এবারের বিশ্ব ইজতেমার অতিথি নিয়ে অসন্তোষ দেখা দিয়ে দিয়েছে। বিশ্ব তাবলীগ জামায়াতের নেতৃত্বের বিরোধ নিষ্পত্তি না হওয়ায় ভারতের তাবলীগের অনেক প্রবীণ অতিথি এবার বিশ্ব ইজতেমায় আসছেন না বলে জানা গেছে।১৯৪৬ সাল থেকেই বাংলাদেশে রমনাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ছোট আকারে ইজতেমার আয়োজন চলছে। পরে টঙ্গিতে স্থায়ীভাবে ইজতেমা আয়োজন শুরুর পর এর পরিধি বেড়ে যায়, বিভিন্ন দেশের অতিথিদের আগমনের কারণে ১৯৬৭ সাল থেকে এই আয়োজনকে ‘বিশ্ব ইজতেমা’হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে।আর জনসংখ্যার দিক দিয়েও টঙ্গির এই ইজতেমায় তাবলীগ জামায়াতের সর্ববৃহৎ জমায়েত অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। তবে ইজতেমা নিয়ে এবারই প্রথম বড় ধরনের অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ বিরাজ করছে তাবলীগ জামায়াতের মধ্যে। আর বাংলাদেশের তাবলীগ জামায়াতের এই অসন্তোষের মূল কারণ বিশ্ব তাবলীগের নেতৃত্বের বিরোধ, যার কেন্দ্রস্থল ভারতের দিল্লীর নিজামুদ্দীন মারকায।জানা যায়, দারুল উলুম দেওবন্দ মাদ্রাসার শিক্ষার্থী হযরত ইলিয়াস (রহ.) ভারতের মেওয়াত অঞ্চলে ১৯২০ সালে তাবলীগের সূচনা করেন। ১৯৪৪ সালের ১২ জুলাই তিনি মারা যাওয়ার পর তার পুত্র ইউসুফ কান্ধলবি (রহ.) বিশ্ব তাবলীগের আমীর নির্বাচিত হন। ১৯৬৫ সালে তার মৃত্যুর পর তাবলীগের আমির হন মাওলানা এনামুল হাসান।তাবলীগের আলেমরা জানিয়েছেন, ১৯৯৫ সালে এনামুল হাসান মারা যাওয়ার পর একক আমীর নির্বাচনের প্রথা থেকে সরে আসে বিশ্ব তাবলীগ জামায়াত। পরে মাওলানা এজাহার, মাওলানা যোবায়েরুল হাসান ও মাওলানা সা’দ কান্ধলবিকে নিয়ে তিন সদস্যের শুরা পদ্ধতির তাবলীগ জামায়াত পরিচালিত হতে থাকে।তাবলীগ সূত্রে জানা গেছে, ২০১৪ সালের মার্চে মাওলানা যোবায়েরুল হাসান মারা যাওয়ার পর থেকেই (মাওলানা এজাহার তার পূর্বেই মারা যান) তাবলীগে মতবিরোধ দেখা দেয়। তিন সদস্যের ওই শুরা কমিটির একমাত্র জীবিত সদস্য মাওলানা সা’দ কান্ধলবি তাবলীগের একক আমীর হওয়ার চেষ্টা করলে দারুল উলুম দেওবন্দ, আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়, সাহরানপুর মাজাহিরুল উলুম মাদরাসাসহ ভারত-পাকিস্তানের তাবলীগের প্রবীণরা এর বিরোধিতা করেন। পরবর্তী সময়ে ১০ সদস্যের একটি শুরা কমিটির খসড়া করা হলেও মাওলানা সা’দ তা মেনে নেননি। আর শুরা পদ্ধতি মেনে না নিয়ে একক নেতৃত্ব গ্রহণ করায় দেওবন্দ মাদরাসার তাবলীগের প্রবীণরা দিল্লীর নিজামুদ্দিন মারকায ত্যাগ করেন, মাওলানা সা’দকে বয়কট করে দেওবন্দ মাদরাসার ওয়েবসাইটে বিবৃতিও প্রকাশ করা হয়।তাবলীগের এই গৃহবিবাদের ঘটনায় দুই পক্ষের সংঘর্ষের ঘটনার ভিডিওচিত্র ভারতের বিভিন্ন গণমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়েছে। আর এর রেশ পড়েছে বাংলাদেশের ইজতেমায়ও।বাংলাদেশের তাবলীগের একজন শীর্ষ আলেম নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বরাবরের মতোই এবারও তাবলীগের আমির মাওলানা সা’দ ও বিশ্ব তাবলীগের প্রবীণদের অতিথি করা হয়েছিল ইজতেমায়। কিন্তু গত ১৫ অক্টোবর ভারতের তাবলীগের প্রবীণরা জানিয়ে দিয়েছেন যে, মাওলানা সা’দ একক নেতৃত্ব ছেড়ে দিয়ে শুরা পদ্ধতি মেনে না নিয়ে টঙ্গিতে আসলে তারা আসবেন না।এদিকে, গত ২৫ অক্টোবর মাওলানা আহমদ শফী এ বিষয়ে বাংলাদেশের কাকরাইল মারকাযকে চিঠি পাঠান। তাতে কাকরাইলের শুরাদের প্রতি বলা হয় যে, মাওলানা সা’দ শুরা মেনে না নিলে ও তাবলীগের প্রবীণদের আস্থাভাজন না হলে তাকে টঙ্গির ইজতেমায় ‘দাওয়াত দেয়া থেকে খুবই গুরুত্বের সাথে বিরত থাকবেন’। এছাড়াও মাহমুদুল হাসান, মুফতি মিজানসহ তাবলীগ সংশ্লিষ্ট দেশের ৪০ জন শীর্ষ আলেম নেতৃত্বের বিষয়টি মীমাংসিত না হওয়ার আগে মাওলানা সা’দকে ইজতেমায় অতিথি না করার দাবি জানান। পাশাপাশি মাওলানা সা’দকে অতিথি করা হলে ইজতেমা বর্জনের কথা জানায় দেওবন্দের অনুসারী দেশের কওমী মাদ্রাসাগুলো। এ নিয়ে বাংলাদেশের তাবলীগের শীর্ষ নীতি-নির্ধারণী পরিষদ কাকরাইলের ১৪ জন শুরা সদস্যও দ্বিধা-বিভক্ত হয়ে যান।তাবলীগ জামায়াতের অভ্যন্তরীণ একটি সূত্র জানিয়েছেন, শুরা সদস্যদের মধ্যে দ্বিধা-বিভক্তি ও শীর্ষ আলেমদের আপত্তির মধ্যেই শুরা সদস্য ও বাংলাদেশের তাবলীগের আমীর ফয়সাল ওয়াসিফুল ইসলাম একক কর্তৃত্বে মাওলানা সা’দকে নিয়ে আসার সিদ্ধান্তে স্থির থাকেন।এক অডিও রেকর্ডে ওয়াসিফুল ইসলামকে ভারতের একজনের সাথে বলতে শোনা যায় যে, মাওলানা (সা’দ) না আসলে ইজতেমাও হবে না বাংলাদেশের তাবলীগের কয়েকজন আলেম জানান, এর আগে বিভিন্নস্থানে আলোচনা-সমাবেশে ওয়াসিফুল ইসলামের দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিষয় তুলে ধরা হয়। তাবলিগের একাংশ ওয়াসিফুল ইসলামের দুর্নীতির বিষয়ে ধর্মমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপিও দেয়। এ প্রেক্ষাপটে নিজের নেতৃত্ব ধরে রাখতে মাওলানা সা’দকে ইজতেমায় নিয়ে আসতে চেয়েছেন ওয়াসিফুল ইসলাম।এদিকে, নানা জটিলতার মধ্যেই বৃহস্পতিবার বিকাল ৪ টায় শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন মাওলানা সা’দ। এর আগে মঙ্গলবার দুপুর ১.৪০ মিনিটে জেট এয়ারওয়েজের ফ্লাইটে দিল্লি থেকে ঢাকায় আসার কথা ছিল তার। কিন্তু ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ তাতে অনুমতি দেয়নি। তাবলীগ সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন যে, ভারতের তাবলীগের আপত্তির কারণেই তাকে প্রথমে আসতে দেওয়া হয়নি।এদিকে, মাওলানা সা’দ ইজতেমায় আসায় মওলানা আহমদ লাট, ভাই মহসীনসহ ভারতের অনেক শীর্ষ আলেম এবার ইজতেমায় আসছেন না বলে জানিয়েছেন তাবলীগের একাধিক আলেম। এর মধ্যে মাওলানা আহমদ লাট প্রতি ইজতেমায় শনিবার (শুক্র, শনি ও রোববার টঙ্গির তুরাগ তীরে ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়) মাগরিবের পর বক্তৃতা করে থাকেন। ফলে মাওলানা সা’দের আগমন ও আহমদ লাটসহ অন্যান্য আলেমদের অনুপস্থিতিতে ইজতেমা নিয়ে তাবলীগের একাংশের আলেমদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে।এ বিষয়ে কথা বলতে বাংলাদেশ তাবলীগ জামায়াতের আমীরে ফয়সাল মাওলানা ওয়াসিফুল ইসলামের দুটো মুঠোফোন নাম্বারে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। এ ছাড়াও তার অন্য নাম্বারটি বন্ধ পাওয়া গেছে।